ভারী বৃষ্টিপাতে ৪৩ জেলায় ফসলের ক্ষতি

চলতি আমন মৌসুম ঘিরে বড় পরিকল্পনা ছিল প্রসাদ রায়ের। গত সপ্তাহেই খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার খলশিবুনিয়া গ্রামের এই কৃষক ১০ কাঠা জমিতে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। আশা ছিল, সেখানে উৎপাদিত চারা দিয়ে ১৭ বিঘা জমিতে ধান চাষ করবেন।

কিন্তু কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে বীজতলাটি পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে গেছে, আর ভেস্তে গেছে তার ভালো ফলনের আশাও।

বারবার চেষ্টা করেও শ্যালো পাম্প দিয়ে পানি সরাতে পারেননি তিনি। চারাগুলো এরইমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বীজতলা তৈরি করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আবার শুরু থেকে সব করতে হবে। টাকাও খরচ করতে হবে। অনিশ্চয়তা তো আছেই।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামের পাশের শালতা নদী গত পাঁচ বছরে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। আমাদের বিলের সব খাল ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় সেগুলো দিয়ে আর পানি নিষ্কাশন হয় না। তার ফল ভুগছি। বছরের পর বছর ধরে আমরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছি।’

প্রসাদের মতো দেশজুড়ে হাজারো কৃষক চলমান ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, খুলনা ও সিলেটসহ ৪৩ জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫ লাখের বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, আদা, হলুদ, পেঁপেসহ অন্যান্য ফসল।

ক্ষতিগ্রস্ত জমির মধ্যে ৭৯ হাজার ৫০০ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর আমনের বীজতলা ও ১৭ হাজার ৮০০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি রয়েছে।

সার্বিকভাবে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষকরা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সবজিগাছ পচে গেছে। অন্যদিকে, নতুন রোপণ করা চারাগুলোও টিকতে পারেনি।

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার চক শৈলমারী গ্রামের কৃষক মিরিন গোলদার ৭০ হাজার টাকা খরচ করে আগাম শিমের চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে প্রায় অর্ধেক চারা নষ্ট হয়ে গেছে।

খুলনা জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অতিবৃষ্টিতে প্রায় ৩৪০ হেক্টর কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ‘কিছু ফসল আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে, কিছু আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর কিছু পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।’

পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, ‘এক একর জমিতে রোপা আমনের বীজতলা করেছিলাম। সেগুলো এখন হাঁটুপানির নিচে। পানি নামলে আবার বীজতলা তৈরি করতে হবে। বাজার থেকে ধানের বীজ কিনতে আবারও খরচ করতে হবে। এই এলাকার বেশিরভাগ কৃষক একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।’

টানা বৃষ্টিতে বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানচাষিরাও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।

পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কাগজিরপুল এলাকার কৃষক বেলায়েত খান, জাকির হোসেন ও জাহাঙ্গীর হোসেনের আশঙ্কা, সম্মিলিতভাবে তাদের লোকসান হতে পারে প্রায় ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা।

৭০ বছর বয়সী বেলায়েত বলেন, ‘আমার সব সঞ্চয় এই বরজে। সব হারালাম।’

ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকা জাকির জানান, তিনি ইতোমধ্যে ব্যাংক ও এনজিওর ঋণের বোঝায় জর্জরিত। জাহাঙ্গীর জানান, এই বিপুল ক্ষতির পর কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন এবং পরিবার  চালাবেন, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় আছেন।

দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিতে নিম্ন আয়ের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সোমবার দ্য ডেইলি স্টারকে পটুয়াখালী শহরের রিকশাচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে যাত্রী সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তায় যাত্রী খুব কম। এমনিতে একদিনে যে আয় করি, আজ তার অর্ধেক হয়েছে। পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফিল্ড সার্ভিস উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করছে।

তিনি বলেন, ‘ফসলের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করাই এখন অগ্রাধিকার। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আমন ধান, আগাম শীতকালীন সবজির বীজ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ। প্রতিকূল আবহাওয়ার পর কৃষক যেন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে এবং কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এসব করা হচ্ছে।’

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্থানীয় প্রশাসন কৃষিখাতের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ শেষ হলে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দ্রুত সহায়তা দেওয়া হবে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘কৃষকের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং দ্রুত কৃষিকাজ শুরু করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেবে।’

এর আগে গত ১১ জুলাই এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী বলেছিলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসন সহায়তা দিতে সরকার তালিকা প্রস্তুত করছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূলত নির্ভর করবে বন্যা কতদিন স্থায়ী হয়, বৃষ্টির তীব্রতা কেমন থাকে এবং কত দ্রুত পানি নেমে যায়—এসব বিষয়ের ওপর।

তিনি বলেন, ‘দ্রুত পানি নেমে গেলে ফসলের সামগ্রিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে এবং পানিতে তলিয়ে যাওয়া কিছু ফসল আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। তবে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, বিশেষ করে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের। দেশের মোট আবাদি জমির তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাণ খুব বেশি না হলেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব ব্যাপক। এর প্রভাব শুধু ফসলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু, মৎস্য খাত ও পশুখাদ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত এবং গবাদিপশুর খাদ্যসংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা এবং খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে যথাযথ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও সময়মতো সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

‘উত্তরাঞ্চল, তিস্তা অববাহিকা এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জের মতো এলাকায় আরও বন্যার আশঙ্কা থাকায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জরুরি’, যোগ করেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts