ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে আবারো তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সোমবার বিকেল থেকে পানি বাড়তে শুরু করে এবং সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে।
পানি বাড়তে থাকায় তিস্তার চরাঞ্চল ও নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তিস্তাপাড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী এলাকায় তিস্তা ব্যারাজ (ডালিয়া) পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৫২ দশমিক ২২ মিটার, যা বিপৎসীমা (৫২ দশমিক ১৫ মিটার) থেকে ৭ সেন্টিমিটার ওপরে।
পানি এখনো বাড়ছে। আগের দিন সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় একই পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপরে।
চলতি মৌসুমে এটি দ্বিতীয়বারের মতো তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করল। এর আগে গত জুন মাসেও নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিয়েছিল।
এদিকে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম ও গঙ্গাধর নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় চরাঞ্চল ও নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে তিস্তাপাড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি বলেন, তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটই খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে ভাটিতে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকায়ও নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের অন্যান্য নদ-নদীর পানি সহজেই ব্রহ্মপুত্রে নেমে যেতে পারছে।
নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় উদ্বেগে পড়েছেন তিস্তাপাড়ের কৃষকরা। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার চণ্ডীমারী এলাকার কৃষক আফাছ উদ্দিন (৬৫) বলেন, নদীর পানি এরইমধ্যে তাদের গ্রামে ঢুকে পড়েছে। যদিও এখনো বসতঘরে পানি ওঠেনি, তবে আমন ধানের বীজতলা তলিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, দুই-তিন দিনে পানি না নামলে বীজতলার বড় ক্ষতি হবে। প্রায় তিন সপ্তাহ আগেও বীজতলা ডুবে গিয়েছিল। তখন দুই দিনের মধ্যে পানি নেমে যাওয়ায় রক্ষা পেয়েছিলাম।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তিস্তার পানি একটু বাড়লেই বানের কষ্ট শুরু হয়। নদীর বুক পলি পড়ে অনেক উঁচু হয়ে গেছে। নদী পানি ধরে রাখতে পারে না। দীর্ঘদিন খনন না করায় পানি উপচে গ্রামে ঢুকে পড়ে, তখনই বন্যা হয়।
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর মিলনবাজার এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান (৫৫)। তিনি বলেন, মঙ্গলবার ভোরে তাদের ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। পরিবারের সদস্য ও গবাদিপশু নিয়ে তারা সরকারি সড়কে আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি বলেন, তিস্তার পানি একটু বাড়লেই আমাদের চর ডুবে যায়। তখন আর বাড়িতে থাকা যায় না। এবার পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে বড় বন্যার আশঙ্কা করছি। সবচেয়ে বেশি চিন্তা আমনের বীজতলা নিয়ে।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, প্রথম দফার বন্যায় দুর্গত এলাকায় প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এবারও জেলা প্রশাসন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
তিনি বলেন, তিস্তাপাড়ের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।
