সাতলুজ: সিনেমায় পাঞ্জাবের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, ভারতের অস্বস্তি

রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্রে নির্মাণ আর তা নিয়ে বিতর্ক ভারতে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে, যেখানে একটা সিনেমা তিন বছরের বেশি সময় ধরে সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে লড়াই করেছে। এমনকি প্রায় ১২০টিরও বেশি দৃশ্য বাদ দেওয়ার চাপ সহ্য করেছে, নাম পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। শেষমেষ ওটিটিতে মুক্তি পেয়েও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। 

সিনেমার নাম ‘সাতলুজ’। এর আগে এর নাম ছিল ‘পাঞ্জাব ৯৫’। পরে তা বদলে পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক নদী সাতলুজের (বাংলায় ‘শতদ্রু’) নামে রাখা হয়। কিন্তু নাম পাল্টালেও ছবির মূল বক্তব্য পাল্টানো যায়নি। 

গত ৩ জুলাই ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘জিফাইভে’ মুক্তি পায় পরিচালক হানি ত্রেহানের ‘সাতলুজ’। এই সিনেমায় এমন একজন মানুষের গল্প বলা হয়েছে, যিনি রাষ্ট্রের ভেতরে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। 

কী আছে সিনেমার গল্পে?

১৬৪ মিনিটের জীবনীভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র যশবন্ত সিং খালরা (দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত)। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা। 

আদালতে সিবিআই-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি পাঞ্জাবের রাজনৈতিক সংগঠন শিরোমণি আকালি দলের মানবাধিকার শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

ঘটনাচক্রে যশবন্ত সিং তার বন্ধু ও তার মায়ের নিখোঁজ হওয়ার রহস্য অনুসন্ধানে নামেন। আর তা করতে গিয়ে তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যা তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

খালরা ১৯৮৪ সালের জুন থেকে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অমৃতসর, মজিথা ও তরন তারনের তিনটি শ্মশানের নথি ঘাঁটেন। তিনি দেখতে পান, প্রায় ২ হাজার ‘বেওয়ারিশ’ মানুষের মরদেহ এনে গোপনে দাহ করেছে পুলিশ। অথচ তাদের অধিকাংশেরই নাম-পরিচয় লেখা আছে আরেকটি নথিতে। পুলিশ সব জেনেও মৃতদের পরিবারকে জানায়নি, কোনো আইনি প্রক্রিয়া মানেনি।  

খালরা তার এই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ভয়াবহ এক অভিযোগ তোলেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। তিনি তিনটি শ্মশানে পাওয়া বেওয়ারিশ লাশের তথ্য প্রকাশ করে দাবি করেন, পুরো পাঞ্জাবে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের নামে অন্তত ২৫ হাজার মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে তাদের লাশ গোপনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বিষয়টিকে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিয়ে যান।

সিনেমাটি এই অনুসন্ধানের গল্পই বলে। আর এর পরিণতিও ছিল নির্মম। ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ৪২ বছর বয়সী খালরাকে তার বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়। 

খালরার স্ত্রী পরমজিৎ স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। পরে সিবিআই তদন্তে উঠে আসে, তাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

সিনেমাটি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন?

এই সিনেমা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে আশির দশকের পাঞ্জাবে।

সেই সময় শিখদের একটি অংশ স্বাধীন ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। রাজনৈতিক বঞ্চনা, পাঞ্জাবের স্বায়ত্তশাসনের দাবি, নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বিরোধ, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে অসন্তোষ ক্রমে সশস্ত্র আন্দোলনে রূপ নেয়।

ভারতীয় রাষ্ট্রও কঠোর অভিযান শুরু করে। ১৯৮৪ সালের জুনে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ নামে এক অভিযান চালায়। উপাসনালয়টি খালিস্তান আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই অভিযানে শত শত শিখ নিহত হন। 

এ ঘটনার জেরে একই বছরের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার দুই শিখ দেহরক্ষীর হাতে নিহত হন। এরপর পাঞ্জাব ও রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভয়াবহ শিখবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। 

স্বর্ণমন্দিরে অভিযানের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল অরুণ কুমার বৈদ্যকে ১৯৮৬ সালে শিখ যোদ্ধারা হত্যা করেন। ১৯৯৪ সালে পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর সুরেন্দর নাথ এবং ১৯৯৫ সালে আত্মঘাতী হামলায় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী বিয়ান্ত সিং নিহত হন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, এই সময় ব্যাপক বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন ও গোপনে মৃতদেহ দাহের মতো ঘটনা ঘটেছে। আর যশবন্ত সিং খালরা সেই অভিযোগগুলোর নথিভিত্তিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। 

সিনেমাটি কেন ভারত সরকারের অস্বস্তির কারণ?

১৯৯৫ সালের ঘটনাকে নিয়ে নির্মিত একটি সিনেমা ‘সাতলুজ’। তাহলে ৩১ বছর পর ২০২৬ সালে এসে এই কাহিনী এত বড় বিতর্ক তৈরি করল কেন? সরকারের মাথাব্যথার কারণ হলো? এমনকি সিনেমার কোথাও খালিস্তান আন্দোলনের প্রচারণাও চালানো হয়নি।

এর উত্তর পাওয়া যাবে বর্তমান ভারতের রাজনীতিতে। আজও ভারত সরকার খালিস্তানপন্থী সংগঠনগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে খালিস্তান-সংক্রান্ত উত্তেজনা এবং ভারতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিতর্কও এই প্রেক্ষাপটকে আরও সংবেদনশীল করেছে।

২০২৩ সালে কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ড এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের পেছনে ভারত সরকারের হাত থাকার অভিযোগ তোলে পশ্চিমা দেশগুলো। এসব ঘটনার সঙ্গে সাতলুজের গল্পটিও যেন মিলে যায়।

ফলে পাঞ্জাবের অতীত নিয়ে নির্মিত এমন একটি চলচ্চিত্র নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিতে পারে, সরকারের এমন আশঙ্কা ছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে। 

ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে ছবিটি সরানো হয়েছে। পরে সরকার একটি কমিটি গঠন করে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই কমিটির মত ছিল, ছবিটি ভারতের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী হতে পারে।

আদালতের নথি, সিবিআই তদন্ত ও বিভিন্ন সরকারি দলিলের ভিত্তিতে নির্মিত হওয়ায় ছবিটিকে পুরোপুরি কাল্পনিকও বলতে পারছে না ভারত সরকার। পরিচালক হানি ত্রেহান নিজেও বলেছেন, ছবির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য আদালতের নথি ও তদন্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। 

নিজের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল থেকে লাইভে এসে অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ বলেন, ‘ছবিটি সরিয়ে নেওয়ায় আমি অবাক হইনি, বরং এটাই প্রত্যাশিত ছিল।’

সেন্সর বোর্ড কী চেয়েছিল?

ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (সিবিএফসি) বা সেন্সর বোর্ড তিন বছর ধরে সিনেমাটির মুক্তি আটকে রাখে। চলচ্চিত্রটি সর্বশেষ ‘পাঞ্জাব ৯৫’ নামে ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল।

ছবিটির বিরুদ্ধে আপত্তি শুধু কয়েকটা সংলাপ নিয়ে ছিল না। খালরা পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেন্সর বোর্ড ছবির নাম বদলাতে বলেছিল।

এমনকি যশবন্ত সিং খালরার নামও বাদ দিতে চেয়েছিল। ভুয়া এনকাউন্টার ও গোপনে শবদাহের তথ্য মুছে ফেলতে বলেছিল। পরিবর্তন করতে বলেছিল বিভিন্ন স্থানের নাম, সেই সঙ্গে প্রায় ১২০টি দৃশ্য বা অংশও বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিল।

এর বিপরীতে খালরা পরিবার বলেছিল, এগুলো বাদ দেওয়া মানে ইতিহাসকেই বদলে দেওয়া। 

সিনেমার শক্তি 

‘সাতলুজ’ কোনো অ্যাকশনধর্মী রাজনৈতিক সিনেমা নয়। এটি ধীরগতির, অনুসন্ধানমূলক একটা গল্প। একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তার ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জ্বলন্ত সাক্ষীতে পরিণত হওয়ার গল্প।

এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য মাত্র ১ রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছেন জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ। 

পরিচালক হানি ত্রেহান ঘটনাগুলোকে চটকদার করার বদলে প্রায় ১ হাজা ৮০০ পৃষ্ঠার আদালতের নথি, নীরবতা ও মানুষের ভয়কে কেন্দ্র করে গল্প বলেছেন। ফলে এটি সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। 

সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে চলচ্চিত্রটি আপলোড করা হচ্ছে এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে গণপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে।

‘সাতলুজ’কে ঘিরে বিতর্কের মূল প্রশ্ন আসলে এর ইতিহাসকে ঘিরে। একটা রাষ্ট্র কি তার অতীতের অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে নির্মিত শিল্পকর্মকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারে? নাকি রাষ্ট্র মনে করে, সেই অতীতকে নতুন করে আলোচনায় আনা বর্তমানের জন্যও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?

‘সাতলুজ’ এসব প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর দেয় না। বরং দর্শককে এমন এক সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের সীমারেখা কোথায় টানা উচিত, তা জানা যাচ্ছে না।

আর সম্ভবত এ কারণেই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই যেমন বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল, মুক্তির পরও তাই।

 

 

Related Articles

Latest Posts