দুর্ঘটনার এক বছর পেরোলেও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী মেহরিন আক্তারের শরীরে এখনো রয়ে গেছে আগুনের ক্ষত। শেষ হয়নি চিকিৎসাও। শরীরের যন্ত্রণার সঙ্গে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে গত বছরের ২১ জুলাইয়ের বিভীষিকাময় স্মৃতিও।
সেদিন দুপুর সোয়া ১টার দিকে উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতলা ভবনে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ। মুহূর্তেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে চারদিক। আগুনে পুড়ে ও চাপা পড়ে প্রাণ হারান শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ অন্তত ৩৫ জন, আহত হন শতাধিক।
এক বছর পর ওই ট্র্যাজেডির স্মরণে আজ মঙ্গলবার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলছিল মেহরিন।
সেদিনের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতির কথা জানতে চাইলে মেহরিন বলছিল, ‘আমি ছিলাম ক্লাস ক্যাপ্টেন। ছুটি দিয়ে সহপাঠীদের বের করে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছিলাম। টিফিনের সময় কেবল খেতে শুরু করি, ঠিক তখনই কানে আসে প্রচণ্ড বিকট শব্দ।’
‘শব্দের পরপরই সবাইকে বসতে বলে আমি দেখতে যাই কী হয়েছে। আমাদের পাশে ছিলেন লরেন্স মিস। তিনি বললেন, “তোমরা বসো, আমি দেখে আসছি কী হয়েছে”। কিছুক্ষণ পর দৌড়ে ফিরে এসে চিৎকার করে বলেন, আগুন লাগছে, তোমরা সবাই বের হও।’
‘আমি অন্যদের সঙ্গে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। কিন্তু চারদিকে তখন শুধু ধোঁয়া। এর মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলি,’ বলছিল মেহেরিন।
‘আমি জানি না কতক্ষণ ছিলাম। এরপর যখন জ্ঞান ফিরল, দেখি গেট খোলা, তখন দৌড়ে বের হয়ে আসি। বাইরে এলে এক ভাইয়া দৌড়ে এসে আমাকে ধরে।’
মেহরিন জানায়, এখনো তার চিকিৎসা শেষ হয়নি। নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হচ্ছে। হাত এখনো ফোলা, তীব্র চুলকানি ও অস্বস্তি রয়েছে।
তার বাবা সালাউদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আহতদের জন্য ঘোষিত ৫ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা নেইনি। আমার মেয়ের হাতে যে সিলিকন শিট ব্যবহার করতে হয়, একটি শিটের দামই এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা। পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে কী চিকিৎসা হবে?’
‘আমরা টাকা চাই না। সরকার আমার মেয়ের পরিপূর্ণ চিকিৎসার দায়িত্ব নিক, এটাই আমাদের চাওয়া,’ বলেন তিনি।
নিহত শিক্ষার্থী তাসমিয়া হকের বাবা নাজমুল হক স্মরণসভায় বলেন, ‘দুর্ঘটনার এক বছর পরও আমাদের পরিবারের জীবন স্বাভাবিক হয়নি। ঘরের খালি চেয়ার, সন্তানের বই-খাতা ও কাপড়-চোপড় আজও আগের মতোই আছে। শুধু নেই আমার সন্তান।’
দুর্ঘটনার পর আহতদের চিকিৎসায় বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক, নার্স, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
নাজমুল হক বলেন, ‘দুর্ঘটনায় আহত অনেক শিক্ষার্থীর চিকিৎসা এখনো চলমান। তাই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়ার আবেদন জানাই।’
আহত শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আবিদুর রহমান আবিদের বাবা মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ট্র্যাজেডির এক বছর পরও আমার ছেলের চিকিৎসা চলমান। আবিদ টানা ছয় মাস হাসপাতালে ছিল। এরপরও নিয়মিত থেরাপি ও ফলোআপ চিকিৎসা চলেছে। চলতি মাসের শুরুতে আরও ২১ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।’
‘কিন্তু তার বাম হাত এখনো স্বাভাবিক হয়নি। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। এখন থেরাপি চলছে। থেরাপিতে উন্নতি না হলে দুয়েকমাস পর আবার অস্ত্রোপচার করতে হতে পারে,’ বলেন তিনি।
আবিদের বাবা আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হাসপাতালে থাকা ও চিকিৎসার সব খরচ সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বহন করেছে। তবে সরকারের ঘোষিত আর্থিক অনুদান আমরা গ্রহণ করিনি। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় এই অনুদান যথেষ্ট নয় বলে আমরা মনে করেছি।’
‘আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া, আমার ছেলের বাম হাতটি যেন আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। তা না হলে তাকে আজীবন একটি অক্ষমতা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। পাশাপাশি আহত শিশুদের জন্য সরকার যেন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। কারণ তারা আর কখনো অন্য সুস্থ শিশুদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে না,’ বলেন তিনি।
