চট্টগ্রাম পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমনের আসল নাম মোবারক হোসেন ওরফে ইমন।
গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও ওই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত ৭টি ফৌজদারি মামলার আসামি তিনি।
দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর অবশেষে আজ বুধবার ভোরে যশোর থেকে বেনাপোল যাওয়ার পথে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
একইসঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় ইমনের ৩ সহযোগী ঢাকার শ্যামপুরের আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (৩৫), মতিঝিলের মো. শামীম (৩০) ও নোয়াখালী জেলার মো. সাফায়েত হোসেনকে (২৮)।
এ তথ্য নিশ্চিত করে যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ যশোর সদরের ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে ডেভিডসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে যশোর সদর উপজেলার যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় ডিবি ও স্থানীয় পুলিশ যৌথভাবে চেকপোস্ট বসায়।
পুলিশ জানান, ভোর সাড়ে ৩টার দিকে চেকপোস্টে ব্যারিকেড দিয়ে একটি কালো প্রাইভেটকার থামানো হয়। ওই গাড়িটিতে ইমন ছিলেন বলে আগেই খবর পাওয়া গিয়েছিল।
এসপি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের দলটি সতর্কভাবে ইমন ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করে ফেলেন।’
জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গাড়িটি থামানোর পর তাদের নামানো হয়। প্রথমে তারা জানান যে তারা বেনাপোলে ঘুরতে যাচ্ছেন।’
‘যেহেতু আমাদের কাছে খবর ছিল, তাই আমরা আরও ভালোভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন ইমনের সহযোগীরা একপর্যায়ে স্বীকার করেন তাদের মধ্যে ইমন আছেন,’ বলেন তিনি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে তারা স্বীকার করেছেন যে ইমন বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।’
পরে তাদের ৪ জনকে আটক করে এসপি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশকে জানানো হয়।
ইতোমধ্যে ইমনসহ ৪ জনকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের মো. মুসার ছেলে। চট্টগ্রামের পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুই প্রধান ব্যক্তির একজন এই ইমন।
এর আগে ‘ছোট সাজ্জাদ’ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন গ্রুপটির নেতৃত্ব দিতেন। সাজ্জাদ বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম গ্রুপটির নেতৃত্ব নিয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
তদন্তকারীরা বলছেন, পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারীরা চট্টগ্রাম শহরসহ রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে চাঁদা দাবি এবং সহিংস হামলার পেছনে জড়িত ছিল।
এই গ্যাংয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গত ১৩ জুলাই। ওই দিন চকবাজার থানার অধীনে চন্দনপুরা-বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোডে ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ৩০-৩৫ জন সশস্ত্র লোক অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা সেখানে ভাঙচুর চালায় এবং নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, ডিডিএন অফিসে হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের নেতৃত্বে ছিলেন ডেভিড ইমন।
হামলার দুদিন আগে ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন একটি আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে ফোন পান। ফোনকারী নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে তার লোকেরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি দখল করে নেবে বলে হুমকি দেয়।
ডিডিএন অফিসটি ‘স্মার্ট গ্রুপের’ পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনের ঠিক পাশেই। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ পাহারার মধ্যেই মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
পুলিশের দাবি, ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা সেই হামলা চালিয়েছিল। এমনকি তার আগে গত ২ জানুয়ারিও একই বাড়িতে এক দফা গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল, যেখানে গুলি এসে জানালা-দরজায় লাগে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪ রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তলসহ ডেভিড ইমনের ২ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। তারা হলেন—মো. আসিফ (২৫) এবং সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)।
