বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে পিছিয়ে শিক্ষার্থীরা, পাবনায় ৩৬৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নোটিশ

বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিখনফল অর্জনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় পাবনা জেলার ৩৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

গত ২০ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে এসব নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের জবাব দিতে প্রত্যেককে তিন থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।  

পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও) মো. আশরাফুল কবির দ্য ডেইলি স্টারকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া ৩৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে সাঁথিয়ার ৭৪টি, আটঘরিয়ার ৫৯টি, পাবনা সদরের ৫৪টি, বেড়ার ৫০টি, চাটমোহরের ৪৮টি, সুজানগরের ৪১টি, ঈশ্বরদীর ২৩টি, ভাঙ্গুড়ার ১১টি ও ফরিদপুর উপজেলার ৭টি বিদ্যালয় রয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে, ‘ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমারেসি’ (এফএলএন) কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত না হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে নোটিশে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এফএলএন কর্মসূচির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে বাংলা বই পড়তে পারবে, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মৌলিক গণিত যেমন—যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করতে পারবে এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সাবলীলভাবে ইংরেজি বই পড়তে পারবে।

গত জুনে জেলার ১ হাজার ১৩৬টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে তারা ৩৬৭টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি দেখতে পান।

কারণ দর্শানোর নোটিশে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রধান শিক্ষক। নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি ও অভিভাবকদের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন তারা।

বেড়া উপজেলার চর নাটিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান শিপন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার স্কুলটি দুর্গম চর এলাকায় অবস্থিত। তিনশর বেশি শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে শিক্ষক মাত্র তিনজন। ফলে পর্যাপ্ত পাঠদান ও নজরদারি করা প্রায় অসম্ভব।’

এছাড়া চরাঞ্চলের অভিভাবকরা সচেতন না হওয়ায় শিশুদের স্কুলে পাঠানোর বদলে কৃষিকাজে পাঠাতে পছন্দ করেন বলেও জানান তিনি।

একই উপজেলার নতুন মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মকবুল হোসেন বলেন, ‘নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা হয়েছে, যা ঠিক হয়নি।’

নোটিশ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার পাশাপাশি উপজেলা শহরের কয়েকটি স্বনামধন্য বিদ্যালয়ও রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ৪০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা।

ঈশ্বরদী পৌরসভার ফতেহ মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬২৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন ১৬ জন, যা মানদণ্ডের সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারপরও এই বিদ্যালয়ে গণিতে সফলতার হার ৫০ শতাংশের কম।

নোটিশের বিষয়ে এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউস সেলিন বলেন, ‘শুধু শিক্ষককে নোটিশ দিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব নয়। অভিভাবকরা সচেতন না হলে এবং শিশুরা নিয়মিত স্কুলে না এলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আশরাফুল কবির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এফএলএন সফল করার জন্য শিক্ষকদের সঙ্গে একাধিক মিটিংও করা হয়েছে।’

শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে শিশুরা যেন বঞ্চিত না হয়—তা নিশ্চিতে শিক্ষকদের কোনোভাবেই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

লিখিত জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

Related Articles

Latest Posts