একসময় সন্ধ্যা নামলেই শাপলা টকিজের সামনে জমে উঠত মানুষের ভিড়। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন, দর্শকদের উচ্ছ্বাস, বাঁশির শব্দ ও পর্দায় তারকাদের উপস্থিতি—এসবই ছিল রংপুরের সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় সেই স্মৃতির পাতাও আজ বন্ধ হয়ে গেল।
প্রায় অর্ধশতকের ইতিহাস বুকে নিয়ে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল ‘শাপলা টকিজ’।
গত শুক্রবার থেকে আর কোনো সিনেমা দেখানো হচ্ছে না শাপলা টকিজে। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রেক্ষাগৃহে আর কোনোদিন সিনেমা প্রদর্শিত হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিনেমা হলটির দায়িত্বে থাকা কামাল হোসাইন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শাপলা টকিজ ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সাল থেকে আমি এই হলের দায়িত্বে আছি। প্রায় ২১ বছর ধরে এর সঙ্গে যুক্ত।’
‘কিন্তু গত কয়েক বছরে এমন অবস্থা হয়েছে যে, সারা বছর চালানোর মতো বাংলা সিনেমা পাওয়া যায় না। শুধু ঈদের কয়েকটি সিনেমা দিয়ে একটি হল চালানো সম্ভব নয়। বিদেশি সিনেমাও প্রদর্শনের সুযোগ নেই। তাই ৩১ জুলাই থেকে হলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছি। ভবিষ্যতে এখানে অন্য কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে,’ বলেন তিনি।
শাপলা টকিজের বিদায়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন চলচ্চিত্র পরিচালক অনন্য মামুনও। তিনি বলেন, ‘সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাগৃহগুলোর মধ্যে শাপলা টকিজ ছিল অন্যতম। ভালো সিনেমার অভাবে এমন একটি হলও টিকে থাকতে পারল না। বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এটি সত্যিই মন খারাপ করা খবর।’
এদিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নস্টালজিয়ায় ভাসছেন অনেকেই।
একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস লিখেছেন, ‘শ্বশুরবাড়ী-২ দিয়ে এই সিনেমাহলটি আমি আবার ওপেন করেছিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে।’
একসময় রংপুর শহরে সিনেমা হলের অভাব ছিল না। শাপলা টকিজ, দরদী হল, ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, নূর মহল, চায়না টকিজ এগুলো খুব পরিচিত নাম। একটির পর একটি প্রেক্ষাগৃহ ছিল শহরের বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র। পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সংস্কৃতি ছিল এই শহরের জীবনেরই অংশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে দর্শক কমেছে, পাল্টেছে বিনোদনের মাধ্যম, কমেছে নতুন সিনেমার সরবরাহ। একে একে অনেক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যায়। সবশেষ সেই তালিকায় যুক্ত হলো শাপলা টকিজ।
শাপলা টকিজের দরজা বন্ধ হওয়া শুধু একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সমাপ্তি নয়; এটি একটি শহরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও একটি অধ্যায়ের ইতি। যে পর্দার সামনে অসংখ্য দর্শক হেসেছেন, কেঁদেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন, সেই পর্দা আজ নিভে গেছে।
রংপুরবাসীর স্মৃতিতে শাপলা টকিজ হয়তো বেঁচে থাকবে বহুদিন—একটি সময়ের প্রতীক হয়ে, যখন সিনেমা হল ছিল মানুষের মিলনমেলা, আনন্দ আর আবেগের ঠিকানা।
