কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ন্যূনতম নিরাপত্তা বিধি ও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’ নামের প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
প্রতিষ্ঠানটির অবহেলা ও নিয়ম লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার দুপুরে প্যারাসেইলিং করার সময় সাগরে পড়ে খুলনার পর্যটক সৌভিক রায় মারা যান বলে প্রশাসন ও স্থানীয়রা মনে করছেন।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ ফরিদ বর্তমানে পলাতক বলে জানান জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান সিয়াম।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়েকদিন ধরে কক্সবাজারে সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে শুধু “ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস” গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।’
নিয়ম অনুযায়ী, বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের বেশি হলে প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন কক্সবাজারে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল, যা উপেক্ষা করেই প্রতিষ্ঠানটি রাইড চালাচ্ছিল।
ম্যাজিস্ট্রেট সিয়াম আরও বলেন, ‘প্যারাসেইলিংয়ের জন্য একজন পর্যটকের সর্বোচ্চ ওজন ৯০ থেকে ৯৫ কেজি হওয়া উচিত। কিন্তু ওই পর্যটকের ওজন ছিল প্রায় ১১০ কেজি। অতিরিক্ত ওজন থাকা সত্ত্বেও তাকে প্যারাসেইলিং করানো হয় এবং তার শারীরিক গঠন ও ওজন অনুযায়ী উপযুক্ত লাইফ জ্যাকেটও দেওয়া হয়নি। এছাড়া প্যারাসেইলিং চলাকালে জরুরি উদ্ধারকাজের জন্য একটি রেসকিউ বোট বা জেট স্কি প্রস্তুত রাখা বাধ্যতামূলক হলেও প্রতিষ্ঠানটি তা রাখেনি।’
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত স্পিডবোটের ইঞ্জিনের ফিটনেস সনদ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদ ফরিদের মালিকানাধীন ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাজনিত অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিলেও, তারা নতুন করে প্যারাসেইলিং চালু করত।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘২০২৫ সালের পর থেকে জেলা প্রশাসন কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্যারাসেইলিং পরিচালনার অনুমোদন দেয়নি। “ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস” অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। একই সঙ্গে তারা ন্যূনতম নিরাপত্তা নির্দেশনাও মানেনি।’
এসব গুরুতর অপরাধ ও অবহেলার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে বর্তমানে ৫টি প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্য চারটির বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ না থাকলেও মোহাম্মদ ফরিদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই চরম অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০টি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ২০১২ সালে সুগন্ধা বিচের কাছে এই কোম্পানির পরিচালিত স্পিডবোটের আঘাতে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
গতকাল দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং করার সময় পড়ে গিয়ে পর্যটকের মৃত্যুর বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মো. শিমুল ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্যারাসেইলিং শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই পর্যটক সাগরে পড়ে যান। স্পিডবোট চালক তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও তীব্র স্রোতের কারণে দ্রুত যেতে পারেননি। পরে তীর থেকে কয়েকজন কর্মী সাঁতরে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।’
দুর্ঘটনার সময় স্থানীয়দের মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাগর থেকে ওই পর্যটককে তীরে আনার পর একটি বিচ বাইকে করে হাসপাতালের দিকে নেওয়া হচ্ছিল। সেসময় উদ্ধারকারীরা তার পেট চেপে পানি বের করার চেষ্টা করছিলেন।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।’
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, নিহতের পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
