বুট জোড়ার অভাবে যেন দেশের জার্সি গায়ে চাপানোর স্বপ্ন ফিকে হয়ে না যায়, তাই অনূর্ধ্ব-১৯ ট্রায়ালে বন্ধুদের থেকে ধার করে জুতো পরে মাঠে নেমেছিলেন এক তরুণ। সেই জুতোও টিকল না, যখন প্রথম বন্ধু দলে সুযোগ পেলেন না। অগত্যা আরেকজনের থেকে জোড়াতালি দিয়ে এক জোড়া স্পাইক ধার করতে হলো, আর তাতেই শেষ হলো তার জীবনের প্রথম অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্ট।
জম্মু ও কাশ্মীরের বারামুল্লার সন্তান আকিব নবি জানতেন—প্রতিকূলতা তো থাকবেই, কিন্তু ভারতের হয়ে খেলতে চাইলে অহেতুক বাহানার কোনো স্থান নেই।
সরকারি স্কুলশিক্ষক মা-বাবার সন্তান আকিবের ক্রিকেটযাত্রার গোড়াপত্তন টেনিস বলে। কিন্তু শক্ত চামড়ার বলে মূলধারার ক্রিকেটে যখন পা রাখলেন, বারামুল্লার অনুন্নত পরিকাঠামো তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। টার্ফ উইকেটে স্পাইক পরে অনুশীলনের সুযোগ সেখানে কোথায়? তাতে অবশ্য দমে যাননি আকিব। সুযোগের জন্য মাথা কুটে না মরে প্রতিদিন সকালে দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ছুটতেন শ্রীনগরে—কেবল একটাই বিশ্বাস বুক আগলে ধরে রেখে, ‘যদি জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন থাকে, তবে অজুহাত বানানো বন্ধ করতে হবে।’
২০২৩ সালের বুচি বাবু ট্রফিতে জম্মু ও কাশ্মীরের বোলিং কোচ পি কৃষ্ণকুমারের সঙ্গে কাজ শুরুর পর থেকেই বদলাতে শুরু করেন এই পেসার। শুরুতে আউটসুইঙ্গার থাকলেও বোলিং বায়োমেকানিক্সের টুকটাক ত্রুটি শুধরে দ্রুতই নিজের ঝোলায় যোগ করেন ক্ষুরধার ইনসুইঙ্গার আর স্ক্র্যাম্বলড-সিমের মার্যাদা। চমৎকার কবজির অবস্থান এবং ম্যাচের পরিস্থিতি দ্রুত বোঝার অদ্ভুত এক ক্ষমতা আকিবকে দ্রুতই অনন্য করে তোলে।
তবে শুধু মাঠের টেকনিক নয়, আকিবের এই রূপান্তরের আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে ছিল তার মানসিকতায়। উইকেটের পেছনে মরিয়া হয়ে না ছুটে, বল নতুন হোক কিংবা পুরনো, পিচ সহায়ক হোক কিংবা নিষ্প্রাণ—একটানা সঠিক জায়গায় বল ফেলে ব্যাটারদের ওপর চাপ বাড়ানোর বিদ্যাটা তিনি আয়ত্ত করে নেন দারুণভাবে।
ফলাফল মেলাতেও বেশি দেরি হয়নি। টানা দুই রঞ্জি মৌসুমে একাই বাগিয়ে নেন ১০৪ উইকেট, অবদান রাখেন জম্মু ও কাশ্মীরের ঐতিহাসিক রঞ্জি ট্রফি জয়ে। ঘরোয়া ক্রিকেটের এই আগুনে পারফর্ম্যান্সের দরুন প্রথমে কড়া নাড়ে ইন্ডিয়া ‘এ’ দলের ডাক। শ্রীলঙ্কা সফরে দুটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৬ উইকেট নেওয়ার পর অবশেষে আসল স্বপ্ন পূরণ—ভারত টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন এই পেসার।
ধার করা জুতোয় শুরু করা যে যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল নিছক লড়াই আর জেদ, সেই পথ ধরেই আজ টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মঞ্চে বারামুল্লার এই পেস সেনসেশন। জীবনের এই নতুন বাঁকে দাঁড়িয়েও আকিবের চোখ শুধু নিজের শক্তির ওপর আস্থা রাখা আর প্রতিদিন নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টায়।
