কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা: ফরিদপুর শিশু পরিবার কর্তৃপক্ষের ‘সীমাহীন গাফিলতি’র কথা জানাল তদন্ত কমিটি

ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন পরিচালিত সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ‘সীমাহীন ব্যর্থতা’ চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি।

গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে ওই এলাকার একটি দর্জির দোকানের মালিক ওয়াহিদ শেখ (৫৪) কিশোরীকে ধর্ষণ করে।

এতে ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে শারিরীক জটিলতা তৈরি হলে ৬ জুলাই তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। চিকিৎসক পরীক্ষার পর তখন জানান, শিশুটি ২৭ সপ্তাহ ২ দিনের অন্তঃসত্ত্বা।

এ ঘটনা তদন্তে গঠিত চার সদস্যের কমিটি গত ২৯ জুলাই জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলামের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

আজ বৃহস্পতিবার কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সুস্মিতা সাহা দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

তদন্ত প্রতিবেদনে ওই ঘটনার পেছনে ফরিদপুর শিশু পরিবারের (বালিকা) তত্ত্বাবধায়কসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব জ্ঞানহীনতা, কর্তব্য পালনে উদাসীনতা ও অবহেলার মানসিকতাকে প্রথম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এছাড়া অভিযুক্ত দর্জির বিকৃত মানসিকতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদনটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ছয়জন হলেন—ফরিদপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও শিশু নিবাসের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার এবং আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির এক সদস্য তদন্তে পাওয়া তথ্যের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধায়কের যতটুকু দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল হওয়া উচিত ছিল, তার কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তত্ত্বাবধায়কের পাশাপাশি আয়া, প্রহরীসহ অন্যান্য কর্মচারীদের যতটা দায়িত্বশীল হওয়ার কথা ছিল, তা দেখা যায়নি, বরং তাদের মধ্যে কোনোভাবে চাকরি করার মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিবাসী কিশোরীদের একটি বড় অংশের ‘‘ডেসপারেট’’ ধরনের মানসিকতা থাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। একা, দুজন বা দলবদ্ধভাবে বের হয়ে যাওয়া ও গভীর রাত করে ফেরার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়নি। এছাড়া তারা যেসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত, সেখান থেকে নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি বারবার তত্ত্বাবধায়ককে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া ওই কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি ছয় মাস পর জানতে পারাকে কর্তৃপক্ষের সীমাহীন গাফিলতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।’

প্রতিবেদনে দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়, ওই কিশোরীর অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। মায়ের মৃত্যুর পর সৎ মায়ের সংসারে বড় হওয়ায় সে ভিন্ন ধরনের মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠে। ভালোবাসা ও স্নেহের অভাবে ওই কিশোরী যেখানে সামান্য সহানুভূতি বা আশ্বাস পেয়েছেন, সেখানেই সঠিক-ভুল বিচার না করে সেটিকে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে অজান্তেই তার ভ্রান্ত পথে পা বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এছাড়া তৃতীয় কারণ হিসেবে ওই দর্জি ব্যবসায়ীর বিকৃত রুচি ও মানসিকতাকে দায়ী করা হয়েছে।

শিশু পরিবারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

এছাড়া শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে সবসময় একজন নারীকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে দর্শনার্থী বা বিভিন্ন কাজে শিশু পরিবারে আসা ব্যক্তিদের তথ্য নিয়মিত নথিভুক্ত ও তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।  অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

কমিটির আহ্বায়ক সুস্মিতা সাহা বলেন, তদন্তকাজ পরিচালনার সময় আমাদের মনে হয়েছে, বালিকা শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব একজন নারীর ওপর ন্যস্ত থাকাই ভালো। পাশাপাশি নিবাসীদের মাসে অন্তত একবার শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, এ ঘটনায় গত ৬ জুলাই ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করা হয়। পরে ৮ জুলাই অভিযুক্ত ওয়াহিদ শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

 

 

 

Related Articles

Latest Posts