রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়াই নদীভাঙনের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই

‘বাহে, বাড়ি কঢাই?’—চিলমারীর চরে এই প্রশ্নটি কেবল সৌজন্য বিনিময়ের প্রতীক নয়। এই প্রশ্নটি একজন চরবাসীর অস্তিত্বের কেন্দ্রে গিয়ে আঘাত হানে।

এই ‘বাড়ি কোথায়?’ প্রশ্নের উত্তরে একজন চরবাসী আঙুল দিয়ে মাঝনদীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘নদীর পেটে।’

তার মানে, অতীতে চরে থাকা তার বসতবাড়ি, ভিটা, গ্রাম—সবই এখন নদীর অতল গর্ভে বিলীন। চর বলতেই তো এই পলি-জলের ভাঙা-গড়ার লীলাখেলা।

দ্বিতীয় দফায় এবার প্রশ্ন আসে, ‘এলাই কই থাকেন (এখন কোথায় থাকেন)?’

এবার আর কোনো দিকে ইঙ্গিত না করেই তিনি বলেন, ‘এলাই তো মুই নদীর সঙ্গে চুক্তি করি থাকং। যেঢে নদী যায়, মুইও ওঢেই যাই।’

এই কথার মধ্যেই চরবাসীর জীবনদর্শন ধরা পড়ে। নদীর ঢেউ যখন ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন করে দেয়, তখন তাকেও অভিবাসন করতে হয়—যেদিকে আশ্রয় মেলে, সেদিকেই।

চরবাসীর কাছে নদীর সঙ্গে এই চুক্তি তাই কেবল রূপক নয়। এটি নদীর স্রোতে ভেসে থাকার এক ভাষা, এক প্রক্রিয়া, এক কৌশল এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে সহাবস্থানের এক সামাজিক ব্যবস্থা।

চরবাসীদের জীবনে এক দীর্ঘ দুর্দশার ও অনিশ্চয়তার সূচনা হয় চর ভাঙার মধ্য দিয়ে। তখন প্রথম প্রশ্নটি মাথায় আসে—এখন কোথায় যাওয়া যায়?

সম্ভবত এখানেই নদীর সঙ্গে চরবাসীর সেই রূপক চুক্তিটি অর্থবহ হয়ে ওঠে।

আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নেওয়া, ‘আদি’ করে থাকা, নতুন জেগে ওঠা চরে বসতি গড়া, দেওয়ানির অধীনে কোথাও ঠাঁই নেওয়া—সবগুলো পথই চরবাসীর কাছে নদীর সঙ্গে সেই বৃহত্তর চুক্তির অংশ। যেদিকে আশ্রয় মেলে, সে দিকেই যাত্রা। তাই চরবাসীরা বলেন, ‘যেঢে নদী যায়, মুইও ওঢেই যাই।’

স্বাভাবিকভাবেই এখানে বাড়ি কোনো স্থায়ী ঠিকানা নয়। পুনর্বাসনের পথও অনেকাংশে ‘ভুক্তভোগী’কেই খুঁজে নিতে হয়। সম্ভবত এ কারণেই ‘চুক্তি’ শব্দটি চরবাসীর কাছে কেবল অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাসের এক বহু অর্থবাহী ধারণা। আর এই বৃহত্তর ও বহু অর্থবাহী চুক্তির ধারণার মধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে জমির মালিক ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে সম্পাদিত বাস্তবের ‘চর চুক্তি’।

নদীভাঙনে গৃহহারা হওয়ার পর অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে হলে, জমির মালিকের সঙ্গে যে লিখিত বা মৌখিক সমঝোতা করতে হয়, সেটিই প্রচলিত ধারণায় ‘চর চুক্তি’।

এই চুক্তির মাধ্যমে একটি পরিবার ঘর তুলতে পারে, কখনো চাষও করতে পারে। এই চুক্তির শর্ত হিসেবে জমির মালিককে অগ্রিম অর্থ দিতে হয়। বাজারদরের তুলনায় তা প্রায়ই কম বা নামমাত্র হলেও, চুক্তিপত্রে সাধারণত সেই অর্থের পরিমাণ উল্লেখ থাকে।

তবে সেই অধিকার স্থায়ী নয়। চর গেলে, চুক্তিও গেল। চিলমারীর চরে প্রায় প্রতিটি পরিবারই জীবনের কোনো-না-কোনো পর্যায়ে চর চুক্তির অধীনে থাকেন। অনেকে, সারা জীবনই থাকেন।

যদি কাগজে চর চুক্তি হয়, তা দেখতে অনেকটা আদালতের দলিলের মতো। সাধারণত সরকার অনুমোদিত স্ট্যাম্প পেপারে এটি লেখা হয়। ভাষাও হয় বেশ আনুষ্ঠানিক, প্রায় আদালতি। সাক্ষীর নাম থাকে, পক্ষদ্বয়ের স্বাক্ষর বা টিপসই থাকে, কখনো লাল বা নীল কালি দিয়ে সিলও মারা হয়।

যিনি লিখতে জানেন না, তিনি বুড়ো আঙুলের ছাপ দেন। আদালত প্রক্রিয়ার অনুকরণে একটি সাধারণ দলিলকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। কাগজের এই বাহ্যিক রূপ চুক্তিটিকে বৈধতার এক আবহ দেয়।

আইনি প্রেক্ষাপটে অবশ্য এই কাগজের কোনো প্রভাব নেই। সরকার বা দেশের আদালত চর চুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না। তবু নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো চরবাসীর কাছে এই কাগজ অন্যের জমিতে থাকার একমাত্র দৃশ্যমান নিশ্চয়তা।

জমির মালিক যদি কথা না রাখেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৃহহারা ব্যক্তি বা পরিবারের আদালতে গিয়ে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই। বিরোধ হলে তা স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হয়। আর সেই মীমাংসায় সাধারণত জমির মালিকের কথাই শেষ কথা। তবে চর চুক্তির ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবে সালিশ বা ফয়সালার সুযোগ থাকে।

ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত ‘সিকস্তি–পয়স্তি বিধিমালা’ (দ্য অ্যালুভিয়ন অ্যান্ড ডিলুভিয়ন রেগুলেশন, ১৮২৫) আজও বাংলাদেশে প্রযোজ্য। এই আইন অনুযায়ী নদীভাঙনে ডুবে যাওয়া জমির মালিকানা সাময়িকভাবে রাষ্ট্রের, কিন্তু চর জেগে উঠলে পূর্বের মালিকই মালিক।

চরের জমি-সম্পর্ক তাই দুই শতাব্দী পুরোনো ঔপনিবেশিক যুক্তিতে চলে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে কোনো ধারা নেই।

চুক্তির ভাষায় যতই নিরাপদ আশ্রয়ের আভাস থাকুক, এর মেয়াদ মূলত একটি বাক্যে নির্ধারিত ‘যতদিন চর থাকে’। সেই মেয়াদ নির্ধারিত হয় নদীর নিজস্ব মর্জিতে, কোনো ক্যালেন্ডারের দিন-তারিখে নয়। চর টিকে থাকলে চুক্তি টিকে থাকে। নদী চর ভেঙে নিলে মালিক নিজেও জমির অধিকার হারান। আর সেখানে বসবাসকারী পরিবারও হারায় তাদের থাকার সুযোগ।

কিন্তু এখানেই অসমতা স্পষ্ট হয় বহু বছর পরে। যদি একই জমি জেগে ওঠে, আইনত পূর্বের মালিক তার মালিকানা পুনরুদ্ধার করতে পারেন। তবে, যে পরিবার সেখানে বছরের পর বছর বসবাস করেছে, পাহারা দিয়েছে, চাষ করেছে, তারা নতুন করে কোনো অধিকার দাবি করতে পারে না।

একটি চর চুক্তি তাই মানুষকে সাময়িক আশ্রয় দেয়। কিন্তু নদীর সঙ্গে বৃহত্তর চুক্তি আরও বড় পরিসরের জন্ম দেয়। চর ভাঙা-গড়ার খেলায় নতুন আশ্রয় খোঁজা, নতুন চুক্তি করা ও আবার জীবন শুরু করার।

চর চুক্তির মাধ্যমে জমির মালিকেরা সুযোগ পান জমির ওপর নিজেদের দাবি বজায় রাখার। খালি জমি দখলদারদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। চরের অনেক জমির মালিক চরে বসবাস করেন না। তারা উজানে, শহরে বা মফস্বলে থাকেন এবং স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে জমির দেখভাল করেন।

তারা জানেন—জমিতে মানুষ থাকা নিরাপত্তা নিশ্চিতের সবচেয়ে সস্তা উপায়। তাই চরের জমির মালিকেরা নদীভাঙনে গৃহহারা পরিবারকে নিজের জায়গায় বসতি করতে দেন। বিনিময়ে সেই পরিবার জমিতে বসবাস করে, চাষাবাদ করে, জমির দখল রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মালিকের উপস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করে।

অনেক ক্ষেত্রেই ফসলের একটি অংশ (সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ) জমির মালিককে দিতে হয়, যা ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের ফল। চরাঞ্চলে এ ধরনের শ্রম ও ভাগচাষভিত্তিক বসবাসকে ‘আদি করা’ বলা হয়। এটি চর চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সম্পূর্ণ পৃথক জিনিস।

বাংলাদেশকে অনেকে ‘ডেভেলপমেন্ট প্যারাডক্স (উন্নয়নের কূটাভাস)’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তীব্র দারিদ্র্য, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েও বাংলাদেশ যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অর্জন করেছে, তা বিশ্বব্যাপী একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এটাই এই প্যারাডক্সের মূল তাৎপর্য। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর দেশে এক ধরনের নতুন সামাজিক চুক্তি গড়ে ওঠে। রাষ্ট্র, দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেন। কিন্তু চিলমারীর চরে সেই চুক্তি ততটা দৃশ্যমান নয়।

হয়তো এখানেই বাংলাদেশের উন্নয়নের প্যারাডক্স বেশি স্পষ্ট। যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, তারাই এখনো সেই অন্তর্ভুক্তির বাইরে। চরবাসীর কাছে ওই ‘চুক্তি’ কোনো আইনি দলিল বা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে করা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নয়। চরাঞ্চলে চুক্তি মানে—প্রায়ই নিজের ভাগ্যের দায় নিজে নেওয়া।

চুক্তি হলেও নদীভাঙনের পর একটি পরিবারের ওপর যে দুর্দশা নেমে আসে, তারচেয়ে করুণ বাস্তবতা খুব কমই আছে। এই বাস্তবতা থেকেই কুড়িগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে একটি গণআহ্বান গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের উদ্যোগে নদীভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইন প্রণয়ন এবং পৃথক চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হচ্ছে।

এই দাবিগুলোর তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই—এতদিন নদীর সঙ্গে চুক্তির শর্ত চরবাসীকেই একতরফাভাবে বহন করতে হয়েছে। এই আন্দোলন সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না; বরং প্রশ্ন তোলে, নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ বোঝা একা চরবাসী কেন বহন করবে?

রাষ্ট্রকে নির্ধারণ করতে হবে—নদী ভাঙনকে কীভাবে শনাক্ত ও নথিভুক্ত করা হবে। কোথায় ভাঙন ঘটেছে, কতটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কী পরিমাণ জমি ও সম্পদ হারিয়েছে। এসব তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না, সেটিও ভাবতে হবে।

যদি না থাকে, তবে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি যা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা ও হিসাব সংরক্ষণ করবে। তাদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করবে।

কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কেমন হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ক্ষতিপূরণ মানুষকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করলেই যে রাষ্ট্র মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবে, তা কিন্তু নয়।

নদীভাঙনের পর ক্ষতিপূরণের অর্থ হাতে পেলে জীবন কোন পথে গুছিয়ে নেবে, সে বিচার না হয় ক্ষতিগ্রস্ত চরবাসীরাই করুক। সেই অর্থ নতুন করে চর চুক্তি করতে, জমি কিনতে, আত্মীয়স্বজনের পাশে বসতি গড়তে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে জীবন পুনর্গঠনে ব্যয় হবে কি না—তা না হয় তারাই ঠিক করুক।

আশ্চর্যের বিষয়, সেই কবে থেকে আমরা নদীভাঙনের কথা শুনে আসছি, নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া গ্রাম, ভিটেমাটি আর মানুষের জীবনের কথা জেনে আসছি; কিন্তু নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষকে পুনর্বাসনের জন্য কিছু অর্থ হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নে এত গড়িমসি কেন?

যে পথেই হোক, মানুষকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের স্বাধীনতা দিতে হবে। চরবাসীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা স্থানীয় নদীর সঙ্গে সহাবস্থানের অভিজ্ঞতালব্ধ কৌশল ও নদীর সঙ্গে সেই বৃহত্তর চুক্তিকেই হয়তো রাষ্ট্রের সহায়তার ভিত্তি হিসেবে ভাবা যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রান্তিকালে নদীভাঙনের মাত্রা ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে বলেই অনুমান করা যায়। এই সময়ে চরবাসীকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার খাদে ঠেলে দেওয়া আর গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে, এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে চরবাসীর পাশে দাঁড়ানোর উপায় কী।

নদীর সঙ্গে চুক্তি চরবাসীরা করেই ফেলেছে; এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্র সেই চুক্তিতে কি কেবল সাক্ষী হিসেবে থাকবে, নাকি সই-ও করবে।

ড. সাদ কাসেম: এসওএএস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক।

Related Articles

Latest Posts