আগস্ট ছাড়িয়ে সেপ্টেম্বরেও বাড়তে পারে ডেঙ্গু

দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যু—দুটোতেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঢাকা বিভাগ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত বিভাগটিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৭১ জন, এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ৪০৪। 

ঘনবসতি, বছরজুড়ে এডিস মশার প্রজনন এবং মশা নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার কারণে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সারা দেশে সমন্বিত ও কেন্দ্রীয় মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৬৪৭ জন। এরপর চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৮২ এবং খুলনায় ২ হাজার ২৭২ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাতেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এ বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২৬ জন, এর মধ্যে ২৫ জনই ঢাকা শহরের বাসিন্দা।

মৃত্যুর হিসাবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা, ১২ জন। চট্টগ্রামে সাতজন এবং ময়মনসিংহে ছয়জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন।

চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ হাজার ৮৮০ জন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হিসাবের ভিত্তিতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জিএম সাইফুর রহমান বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব, বছরজুড়ে এডিস মশার প্রজনন এবং মশা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, উষ্ণ আবহাওয়া এবং মশার প্রজননের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকায় ঢাকা এডিস মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাসের সারা বছর ছড়িয়ে পড়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। এ কারণেই শহরটি ডেঙ্গুর হটস্পটে পরিণত হয়েছে।

সাইফুর রহমান বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগে সেন্ট্রাল মেট্রোপলিটন উইমেন’স কলেজে একটি পরীক্ষা তদারকির সময় আমি পানিভর্তি একটি ছোট পাত্রে এডিস মশার লার্ভা দেখতে পাই। শহরের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের প্রজননস্থল রয়েছে। এতে বোঝা যায়, আবাসিক এলাকাগুলোতেও এডিস মশার প্রজনন অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ এখনো মূলত প্রতিরোধমূলক না হয়ে পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সাইফুর রহমান বলেন, সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকার সময় মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম জোরদার করা। ওই সময়ে মশার প্রজননস্থলও কম থাকে এবং নেওয়া উদ্যোগ বেশি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সাধারণত ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ার পরই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাড়ানো হয়। ততক্ষণে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

তার মতে, বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ও আগাম পরিকল্পনাভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গড়ে না ওঠাও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দেশগুলো সাধারণত ভালো ফল পায়। এর বিপরীতে বিভিন্ন শহরে ভিন্ন ভিন্নভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা হলে কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় থাকে না এবং ফলও একেক জায়গায় একেক রকম হয়।

সাইফুর রহমান বলেন, সারা দেশে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সমন্বয়, তদারকি ও নজরদারির জন্য বিশেষজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের নিয়ে একটি জাতীয় মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সমন্বিত জাতীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেন, আগস্টজুড়েই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে এবং সেপ্টেম্বরেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, আগস্টে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নাও পৌঁছাতে পারে। এ বছর সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায় সেপ্টেম্বরেও হতে পারে। তবে আমরা বলতে পারি, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং উৎসস্থল ব্যবস্থাপনা।

তিনি বলেন, মূল কৌশল হলো মশার প্রজননস্থল নির্মূল করা। যেসব প্রজননস্থল অপসারণ বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী কীটনাশক বা মশার বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান ব্যবহার করতে হবে।

মশা নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকারও আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

Related Articles

Latest Posts