‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ ২৫ সংগঠনের

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ২৫টি আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

আজ বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা দুই মন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর, বিভ্রান্তিকর, ইতিহাস ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ আদিবাসী নয়।’

তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের মূল পরিচয় ‘বাংলাদেশি’ এবং দেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই।

বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক।

সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র গ্রহণের সময় বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল। এছাড়া আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র ও আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাধ্যতামূলক নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সংগঠনগুলো বলছে, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ৫০টির বেশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা ও জীবনধারা নিয়ে বসবাস করছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামে আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ থাকলেও স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।

এর ফলে আদিবাসীরা বর্তমানে জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্তির ঝুঁকি ও সংকটের মুখে রয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনগুলো।

তাদের ভাষ্য, আদিবাসীদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ভূমির অধিকারের স্বীকৃতি প্রয়োজন। সেখানে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এমন বক্তব্য তাদের আরও প্রান্তিক করে তুলছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০০৭ সালে জাতিসংঘের গৃহীত আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্রের বাস্তবায়ন ও প্রতিপালন জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ওই ঘোষণাপত্র গ্রহণের সময় ভোটদানে বিরত থাকলেও সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এটি বাস্তবায়নের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে বলে সংগঠনগুলোর দাবি।

তারা জানায়, ২০০৭ সালে ঘোষণাপত্রের বিরোধিতা করে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র ভোট দিয়েছিল। পরে অস্ট্রেলিয়া ২০০৯ সালে, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র ২০১০ সালে এবং কানাডা ২০১৬ সালে ঘোষণাপত্রকে সমর্থন করে।

বিবৃতিতে মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে’ রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও বিশেষ সুযোগ দিয়ে জাতীয় জীবনের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়।

সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের চিন্তার মধ্যে আদিবাসীদের স্বতন্ত্র সত্তা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, জীবনাচরণ ও বিশ্বাসকে নিজস্বভাবে বিকাশের সুযোগ দেওয়ার বদলে তথাকথিত মূলধারার বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে একীভূত করার ইঙ্গিত রয়েছে। এটি বিএনপির ৩১ দফায় দেওয়া ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও অসঙ্গতিপূর্ণ বলে তারা মনে করে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ‘একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ন্যায়, সমতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

১. বাংলাদেশের আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

২. আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ আদিবাসীদের ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৩. আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ২০০৭ সালের আদিবাসীবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খেয়াং স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশনসহ মোট ২৫টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা সই করেছেন।

Related Articles

Latest Posts