মাঠের ভুল আর মাঠের বাইরের বর্ণবাদী আক্রমণের মতো কঠিন সময় পার করে অবশেষে নিজেকে বড় মঞ্চে প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছেন জায়ন সুজুকি। জাপানের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে দামি গোলরক্ষক হয়ে ইতালিয়ান ক্লাব পার্মা থেকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল অ্যাস্টন ভিলায় যোগ দিচ্ছেন ২৩ বছর বয়সী এই ফুটবলার।
সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৫০ লাখ ইউরো (প্রায় ৪ কোটি ডলার) ট্রান্সফার ফি-তে ভিলায় যাচ্ছেন সুজুকি। ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর খবর অনুযায়ী, ক্লাবের সঙ্গে তার পাঁচ বছরের চুক্তি হতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রথম জাপানি গোলরক্ষক হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে খেলার ইতিহাস গড়বেন তিনি। সুজুকির এই আগমনে ভিলার বর্তমান প্রধান গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের ক্লাব ছাড়ার গুঞ্জন আরও জোরালো হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে জন্ম নেওয়া সুজুকির বাবা ঘানাইয়ান এবং মা জাপানি। শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে জাপানে চলে আসেন। জাপানি ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে বেলজিয়াম ও ইতালিতে খেলার পর এবার তার নতুন গন্তব্য ইংল্যান্ড। জাতীয় দলের হয়ে ইতিমধ্যে ২৮টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন তিনি।
প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) মতো বড় ক্লাবের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অ্যাস্টন ভিলাকেই বেছে নিয়েছেন সুজুকি। কারণ প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ চাপ সামলানোর মতো দক্ষতা তার আছে বলেই বিশ্বাস এই তরুণের। ফিফার ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘শুধু চোখধাঁধানো সেভ করা নয়, মূল লক্ষ্য হলো দলের রক্ষণে ভরসা ও স্থায়িত্ব আনা। মূল কাজগুলো নিখুঁতভাবে করে যেতে চাই, যাতে গোল হজম করতে না হয়।’
জাপানি ক্লাব উরাওয়া রেডসের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা সুজুকি ঘরোয়া লিগে হাতে গোনা কয়েকটি ম্যাচ খেলেই জাতীয় দলে ডাক পান। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও কেবল নিয়মিত একাদশে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালে বেলজিয়ামের সিন্ট-ট্রুইডেনে যোগ দেন।
তবে আসল পরীক্ষা আসে ২০২৪ এশিয়ান কাপে। জাপানের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হলেও টুর্নামেন্টে বেশ কিছু মারাত্মক ভুল করে বসেন তিনি। দল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে তীব্র বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হতে হয়। কিন্তু সেই সময় ভেঙে না পড়ে সুজুকি বলেছিলেন, ‘অনলাইনের এসব গালিগালাজ আমাকে থামাতে পারবে না। মাঠের ভালো পারফরম্যান্স দিয়েই আমি এর জবাব দেব।’
কথাটি তিনি রেখেছেন। ২০২৪ সালে পার্মায় যোগ দিয়ে প্রথম জাপানি গোলরক্ষক হিসেবে ইতালির সেরি আ-তে খেলেন। ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির সুঠাম দেহের কারণে ইতালিতে সতীর্থরা তাকে ডাকতেন ‘অ্যানিমেল’ নামে।
২০২৫-এর শেষে হাত ভেঙে মাঠের বাইরে গেলেও ২০২৬ বিশ্বকাপে সময়মতো সুস্থ হয়ে ফিরে দারুণ পারফর্ম করেন। নেদারল্যান্ডস, তিউনিসিয়া ও সুইডেনকে পেছনে ফেলে জাপানের শেষ ৩২-এ ওঠার পেছনে তার বড় ভূমিকা ছিল। সেখানে ব্রাজিলের বিপক্ষে দারুণ লড়লেও ৯৫ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোলে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় জাপান।
ভিলায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমে ২০০০-এর শুরুর দিকে পোর্টসমাউথে খেলা ইয়োশিকাতসু কাওয়াগুচির পর ইংলিশ পেশাদার ফুটবলে পা রাখা দ্বিতীয় জাপানি গোলরক্ষক হতে যাচ্ছেন সুজুকি।
শুরুর দিনের ভুল থেকে পাওয়া শিক্ষা নিয়ে সুজুকি বেশ খোলামেলা, ‘শুরুতে অভিজ্ঞতার অভাবে বেশ কিছু ভুল হয়েছিল। কিন্তু মানসিকভাবে তা আমাকে পরিপক্ব করেছে। এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই দলকে ভরসা দিতে পারি।’
বিশ্বসেরা হওয়ার লক্ষ্য জানিয়ে সুজুকি যোগ করেন, ‘ব্যক্তিগত ও দলগত—দুই দিক থেকেই আমি বিশ্বের সেরা হতে চাই। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও বিশ্বকাপের মতো ট্রফি জেতাই আমার মূল স্বপ্ন।’
