একদিকে ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা। এই দুইয়ে মিলে মিয়ানমারের নিপীড়িত এই সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের জন্য এক ক্রমবর্ধমান বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে এবং এটি দীর্ঘ ৯ বছরের এই পুরোনো সংকটকে আরও প্রকট করে তুলবে।
কক্সবাজার ক্যাম্পের পরিস্থিতির অবনতি এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনের আশা ফিকে হয়ে আসায় বাংলাদেশের ওপর আর্থিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বোঝার ভার ক্রমেই বাড়ছে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ০২ লাখে। তাদের মধ্যে ৩৯ হাজার ৮৫৬ জন নব্বইয়ের দশকে এসেছিলেন, আর ১০ লাখের বেশি মানুষ ২০১৭ সালের সেই বিশাল ঢলের সময় থেকে বাংলাদেশে আশ্রিত।
ওই বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু হয়, যা প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে।
তারপর থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক ২ দশমিক ৬ লাখ রোহিঙ্গা শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র হওয়ায় আরও ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন।
রোহিঙ্গাদের আসা এখনও অব্যাহত আছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।’
এর বিপরীতে, মানবিক সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের পরিমাণ স্পষ্টতই কমে গেছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয় অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় ৩১৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গিয়েছিল। অন্যদিকে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের পরিকল্পনায় তহবিলের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬৮৮ দশমিক ১ মিলিয়ন এবং ৬৯২ মিলিয়ন ডলার।
২০২০ সালে এই তহবিল কমে ৬৩০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, তবে ২০২১ সালে তা বেড়ে ৬৮৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার হয়েছিল। এরপর তহবিল আবার কমতে শুরু করে। ২০২২ সালে ৬১৯ দশমিক৭ মিলিয়ন, ২০২৩ সালে ৬১৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে তা আরও কমে ৫৮১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
২০২৫ সালে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। সে বছর ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যায় মাত্র ৪৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার—যা মোট প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ৪৬ শতাংশ।
২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও এর সহযোগীরা ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে। শরণার্থী জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও এই সহায়তার পরিমাণ গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এটি মূলত বিশ্বজুড়ে মানবিক অর্থায়নের সংকটের কারণে হয়েছে। দাতারা সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে শুধুমাত্র অতি-জরুরি বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ছোট পরিকল্পনা তৈরির অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
চাপের মুখে বিভিন্ন সেবা
তহবিলের এই ঘাটতি এরইমধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবাগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
২০২৩ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) মাসিক খাদ্য বরাদ্দ ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৮ ডলারে নামিয়ে আনে। ওই বছরের নভেম্বরের মধ্যে সংস্থাটি জানায়, ক্যাম্পের ৯০ শতাংশ বাসিন্দার পর্যাপ্ত খাবার কেনার সামর্থ্য নেই এবং ১৫ শতাংশ শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।
২০২৪ সালে খাদ্য বরাদ্দ পুনরায় ১২ ডলারে উন্নীত করা হয়। তবে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অসহায়ত্বের মাত্রা অনুযায়ী খাদ্য সহায়তাকে আবারও নতুনভাবে বিন্যাস করা হয়েছে। বর্তমানে অতি-অসহায়দের জন্য ১২ ডলার, মাঝারি পর্যায়ের অসহায়দের জন্য ১০ ডলার এবং সাধারণ অসহায় রোহিঙ্গাদের জন্য ৭ ডলার করে মাসিক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, এই কমে যাওয়া সহায়তা শরণার্থীদের মধ্যে চরম পুষ্টিহীনতা দেখা দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবাগুলোও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হাজারো ত্রাণকর্মী এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক তাদের কাজ হারিয়েছেন।
মিজানুর রহমান আরও জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত শিক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার থেকে কমে এখন ৬ হাজারের নিচে নেমে এসেছে।
উখিয়ার ৬ নম্বর ক্যাম্পের ২২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিক্ষক এহসান উল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীরা গত চার বছর ধরে কোনো নতুন বই, খাতা, পেন্সিল বা স্কুলব্যাগ পাচ্ছে না।
জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গাদের অনেক অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং সেগুলো মেরামত করা প্রয়োজন, কিন্তু প্রয়োজনীয় তহবিল নেই। এ ছাড়া নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা পাহাড়ের ঢালে তাঁবুতে বসবাস করছে, কারণ কর্তৃপক্ষ এখনও নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়নি। ফলে বর্ষা মৌসুমে তাদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
রোহিঙ্গা শিক্ষক এহসান বলেন, ‘এখন বর্ষার মৌসুম, আর রাস্তাঘাট এতটাই জরাজীর্ণ ও কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে যে মানুষের পক্ষে শৌচাগারে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
জীবিকার সুযোগ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ট রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এহসান আরও বলেন, ‘অধিকাংশ তরুণের কোনো কাজ নেই। তারা ক্যাম্পের বাইরে চলে যাচ্ছে, এমনকি মালয়েশিয়া পৌঁছানোর জন্য সমুদ্রপথে বিপজ্জনক যাত্রায় নাম লেখাচ্ছে। অনেকে আবার অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে।’
তিনি বলেন, একটি পুরো প্রজন্ম পর্যাপ্ত শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা ভবিষ্যৎ আশা ছাড়াই বেড়ে উঠছে, যা বাল্যবিবাহ এবং অনিরাপদ অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি ফ্রেইসেন বলেন, ‘শিক্ষা হলো আশার আলো এবং রোহিঙ্গা জনগণের ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বিনিয়োগ। এসব সেবা সংকুচিত করার ফলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের জরুরি সংকট তৈরি হতে পারে।’
আড়ালে থেকে যাওয়া হিসাব
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মূলত খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অন্যান্য মানবিক সেবার জন্য অর্থায়ন করে থাকে। তবে বাংলাদেশকেও নিজস্বভাবে বিশাল পরিমাণ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদনে পুরোপুরি ফুটে ওঠে না।
২০২৫ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পেছনে বাংলাদেশ সরকার ৬৫৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই হিসাবের মধ্যে নিরাপত্তা খরচ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বা ভাসানচরের জন্য করা খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। মিজানুর রহমান জানান, ক্যাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, এপিবিএন, র্যাব এবং পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমাজসেবা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বেশ কয়েকটি সংস্থা এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক খরচ ভাগ করে নিচ্ছে। সেই অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত গত ছয় বছরে রোহিঙ্গা সংকটের পেছনে সরকারের মোট ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন (১৫০ কোটি) ডলার। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি খরচ হয়েছে নিরাপত্তা খাতে এবং আরও ১৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কারণে।
২০১৭ সালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বসতির জন্য বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩ হাজার একর জমি বরাদ্দ করেছিল। বর্তমানে ৩৩টি ক্যাম্প প্রায় ২৩ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।
কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে সরকার ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ভাসানচরকে একটি বিকল্প আবাসন হিসেবে গড়ে তুলেছে।
ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি ফ্রেইসেন বলেন, রোহিঙ্গারা এখনও বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত জনগোষ্ঠী এবং মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তারা সেখান থেকে পালিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে এক বিরাট বোঝা বহন করছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই দায়ভার আরও বেশি করে ভাগ করে নিতে হবে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমারের সাথে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করা প্রয়োজন।
‘এটি একটি মানবিক তাগিদ। একে উপেক্ষা করা হলে এর তাৎক্ষণিক পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
