ক্যালিফোর্নিয়ার জীবন পেছনে ফেলে আবারও যুক্তরাজ্যে ফিরছেন প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেল। সঙ্গে থাকছে তাদের দুই সন্তান, আর্চি ও লিলিবেট। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিবারটি যুক্তরাজ্যে এসে বসবাস শুরু করবে বলে জানা গেছে।
তবে এবার তাদের ব্রিটিশ জীবন ঠিক কেমন হবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিনয়ে ফিরবেন মেগান? হ্যারি কি আবারও রাজপরিবারের কাছাকাছি আসবেন? সন্তানদের কোথায় পড়ানো হবে? আর তাদের কি রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিক আয়োজনে দেখা যাবে?
এসব প্রশ্নের সব উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। তবে হ্যারি-মেগানের অগ্রাধিকার নিয়ে ধীরে ধীরে কিছু বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে।

বিবিসি বলছে, যুক্তরাজ্যে ফেরার খবরের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মেগানের অভিনয়ে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে। সম্প্রতি খবর ছড়িয়েছে, নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ দ্য জেন্টলমেন-এর তৃতীয় মৌসুমে দেখা যেতে পারে তাকে।
ব্রিটিশ নির্মাতা গাই রিচির তৈরি এই সিরিজের গল্প একজন ডিউককে ঘিরে, যিনি পরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সিরিজটির বড় একটি অংশের শুটিং হয় ইংল্যান্ডের কটসওল্ডস এলাকায়, যে এলাকাকেই হ্যারি-মেগান তাদের নতুন ব্রিটিশ ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মেগানের অভিনয়ে ফেরার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
অবশ্য অভিনয়ে ফেরার ইচ্ছা মেগানের রয়েছে, এটা অনেকটাই স্পষ্ট।
গত বছর ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ও পডকাস্টার এমা গ্রেডের সঙ্গে আলাপকালে নিজের নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘উইথ লাভ, মেগান’ নিয়ে কথা বলেছিলেন মেগান। তখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অভিনয়ের দিনগুলো মিস করেন কি না।
মেগানের উত্তর ছিল, ‘কখনো কখনো।’
বিবিসি বলছে, মেগানের জন্য অভিনয়ে ফেরাটা কেবল পছন্দের বিষয় নয়, তার জন্য অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি, সন্তানদের স্কুল, নিয়মিত যাতায়াত, সব মিলিয়ে হ্যারি-মেগানের জীবন বেশ ব্যয়বহুল। তাই অভিনয়ের মতো বড় একটি পেশাগত সুযোগ পরিবারের জন্য আর্থিকভাবেও লাভজনক হতে পারে।

মেগান যখন অভিনয় ও নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হতে পারেন, তখন হ্যারির প্রধান মনোযোগ থাকবে দাতব্য কাজ ও বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্বে।
যুক্তরাষ্ট্রে তার সাম্প্রতিক দাতব্য কার্যক্রমের পর এবার যুক্তরাজ্যে ফিরে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে হ্যারি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য ও তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। আহত সেনাসদস্যদের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিকেল সেন্টারও পরিদর্শন করেন তিনি।
এরপর যান আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেটারিতে। সেখানে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে নিহত অনেক মার্কিন সেনার সমাধি রয়েছে। হ্যারি নিজেও সেনাবাহিনীতে থাকার সময় দুটি সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
সেখানে আফগানিস্তানে আহত হয়ে পরে মারা যাওয়া সার্জেন্ট মাইকেল ভেরার্ডোর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান তিনি। ভেরার্ডোর স্ত্রী সারাহ ও তাদের নয় বছর বয়সী মেয়ে এলিজাবেথের সঙ্গেও দেখা করেন হ্যারি।
এলিজাবেথের কাছে রাজপুত্র মানেই যেন রূপকথার চরিত্র। বাবার সঙ্গে দেখা করার পর সে মাকে ফিসফিস করে নাকি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ওনার মুকুট কোথায়? গাড়িতে রেখে এসেছেন?’

যুক্তরাজ্যে ফেরার পর সেপ্টেম্বরে হ্যারির বেশ কিছু দাতব্য অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
মাসের শেষ দিকে লন্ডনে অনুষ্ঠিত ওয়েলচাইল্ড অ্যাওয়ার্ডসে যোগ দেবেন তিনি। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের সাহস ও সংগ্রামকে সম্মান জানানো এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত হ্যারি।
তবে আগামী বছর হ্যারির ব্যস্ততার বড় অংশজুড়ে থাকবে ইনভিকটাস গেমস। আহত ও অসুস্থ সামরিক সদস্যদের জন্য আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আগামী জুলাইয়ে বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এই আয়োজনকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে রাজা তৃতীয় চার্লস যদি গেমসের উদ্বোধন করেন, তাহলে বহু বছর পর বাবা ও ছেলেকে একই অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে দেখা যেতে পারে।
তবে এটি এখনো কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা নয়। ইনভিকটাস গেমসের আয়োজকদের একটি প্রত্যাশা হিসেবেই বিষয়টি রয়েছে।

হ্যারি-মেগানের নতুন ব্রিটিশ জীবন সম্ভবত শুরু হবে ইংল্যান্ডের মনোরম এলাকা কটসওল্ডসে।
২০১৮ সালে বিয়ের পরও তারা কিছু সময়ের জন্য এই এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে তাদের বেশ কিছু বন্ধুও রয়েছেন। ফলে জায়গাটি তাদের কাছে একেবারে অপরিচিত নয়।
কটসওল্ডসের জীবন অবশ্য লন্ডনের রাজকীয় ব্যস্ততা থেকে অনেকটাই আলাদা। সবুজ গ্রাম, ছোট ছোট শহর, পুরোনো পাথরের বাড়ি ও শান্ত পরিবেশের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চল।
এই এলাকায় তাদের জীবনযাপন নিয়ে সাবেক স্পাইস গার্ল গেরি হর্নার ও তার স্বামী ক্রিশ্চিয়ান হর্নারের পরামর্শ নেওয়ার খবরও ছড়িয়েছিল। তবে হ্যারি-মেগানের মুখপাত্র সেই খবর নাকচ করেছেন।

যুক্তরাজ্যে ফিরে প্রথম দিকে মেগানের সবচেয়ে বড় ব্যস্ততা হবে সন্তানদের নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ানো।
আর্চির বয়স সাত বছর, আর লিলিবেটের পাঁচ। নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু, নতুন রুটিন, সবকিছুর সঙ্গে তাদের পরিচিত করিয়ে দিতে হবে।
মেগান আপাতত বড় কোনো নিয়মিত জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে যাবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সন্তানদের স্কুলজীবনে অভ্যস্ত করে তোলার পাশাপাশি নিজের ব্যবসা অ্যাস এভার পরিচালনা এবং অভিনয়ের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করবেন তিনি।
হ্যারির কোনো কোনো দাতব্য অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে মেগানকেও দেখা যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যে ফিরলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না তারা। ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেসিটোতে তাদের কোটি ডলারের বাড়িটি রেখে দেবেন। হ্যারির শাশুড়ি ডোরিয়া র্যাগল্যান্ডও ক্যালিফোর্নিয়াতেই থাকবেন। নাতি-নাতনিদের দেখাশোনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
পরিবারটি নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পর্তুগালের মেলিদেসের কাছে কেনা তাদের অবকাশকালীন বাড়িটিও ব্যবহার করবেন।
ওই বাড়ির কাছেই একটি সম্পত্তি রয়েছে প্রিন্সেস ইউজেনি ও তার স্বামী জ্যাক ব্রুকসব্যাংকের। রাজপরিবারের সঙ্গে হ্যারি-মেগানের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও ইউজেনির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা বজায় রয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্য এখানেই। যুক্তরাজ্যে ফিরে হ্যারি-মেগান কি আবার রাজপরিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা দেবেন?
আগামী কয়েক মাসে এমন বেশ কিছু অনুষ্ঠান রয়েছে, যেখানে রাজপরিবারের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের উপস্থিতি প্রত্যাশিত। এর মধ্যে রয়েছে রিমেমব্রেন্স সানডে, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে প্রিন্সেস অব ওয়েলসের ক্যারল সার্ভিস এবং স্যান্ড্রিংহামে বড়দিনের আয়োজন।
এসব অনুষ্ঠানে হ্যারি-মেগানকে আমন্ত্রণ জানানো হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কারণ তাদের সঙ্গে রাজপরিবারের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের সংকট এখনো বড় বিষয়। রাজপরিবারের কিছু সদস্যের মধ্যে সতর্কতা, অস্বস্তি এমনকি বিরূপ মনোভাবও রয়েছে বলে জানা যায়।
তাই তাদের ভবিষ্যৎ উপস্থিতি নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

হ্যারি-মেগানের দল যুক্তরাজ্যে তাদের এই ফিরে আসাকে বলছে ‘দীর্ঘ সময়ের’ জন্য থাকা। অর্থাৎ স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।
বরং সন্তানদের কিছুটা বড় হওয়ার আগেই ব্রিটিশ জীবনের অভিজ্ঞতা দেওয়া, তাদের দাদা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি লক্ষ্য তাদের থাকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর, হ্যারি-মেগান নিজেরা ব্রিটিশ জীবন কতটা পছন্দ করেন, ব্রিটিশ জনগণ তাদের কীভাবে গ্রহণ করে এবং রাজপরিবার কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে।
