‘আমরা অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিতে গেলে যখন জানে আমরা সুইপার, তখন বাসা ভাড়া দিতে চায় না। টু-লেট থাকলেও পরিচয় জানার পর বলে, বাসা ভাড়া হয়ে গেছে। আমরা কি অভিশাপ? আমাদের চার পুরুষ প্রায় ২০০ বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছে। আমাদের এখন কেনো উচ্ছেদ করা হচ্ছে আমরা সুইপার বলে?’
কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকা হরিজন সম্প্রদায়ের যতি আক্তার। আজ বৃহস্পতিবার হাসপাতালটির ১নং মিনিয়ালস কোয়ার্টারে বসবাসরত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবাস্থল উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মানববন্ধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
যতি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা এ দেশে এসে থাকার জায়গা পায়, কিন্তু আমরা হরিজনরা কেন থাকার জায়গা পাব না? আমরা তো এ দেশের নাগরিক। আমরা এ দেশের সন্তান। আমাদেরও তো থাকার অধিকার আছে।’
তিনি বলেন, ‘ভোট চাওয়ার সময় তো কেউ বলে না আমরা সুইপার। তখন আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসেন, বুকে টেনে নেন। এখন কেন আমাদের সুইপার বলে উচ্ছেদ করা হচ্ছে?’
‘এত বছর ধরে আপনাদের জন্য পরিষ্কারের কাজ করছি। এই যে এত সুন্দর পরিষ্কার পরিবেশে আপনারা আছেন, কাদের জন্য আছেন? আমাদের জন্যই আছেন। আমরা যদি একদিন কাজ বন্ধ করে দিই, তাহলে আমাদের মর্ম বুঝতে পারবেন’, বলেন তিনি।
মানববন্ধনে হরিজন সম্প্রদায়ের পরেশ মজুমদার প্রশ্ন তোলেন, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে যে জনগোষ্ঠী সেখানে বসবাস করে আসছে, উন্নয়নের অজুহাতে তাদের উচ্ছেদ করা প্রয়োজন কেন?
তিনি বলেন, ‘মিটফোর্ড হাসপাতাল ১৮৫৮ সালের ১ মে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই হরিজনরা এখানে বসবাস করে আসছে। প্রায় ২০০ বছর ধরে আমাদের চার প্রজন্ম এখানে বসবাস করছে। অথচ এখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উন্নয়নের জন্য এক নম্বর মিনি কোয়ার্টার ভেঙে আমাদের উচ্ছেদ করতে চায়।’
হাসপাতালের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মীদের আবাসনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখানে ডাক্তাররা থাকেন, নার্সরা থাকেন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মীরা থাকেন। তাহলে চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা, হরিজনরা এখানে থাকলে সমস্যা কোথায়?’
তিনি আরও বলেন, ‘উন্নয়ন করার জন্য অনেক জায়গা আছে। অগ্রণী ব্যাংক আছে, ডাক্তার কোয়ার্টার আছে, মাঠ আছে, তৃতীয় তলা ও তিন নম্বর ভবন আছে। যদি উন্নয়ন করতে চান, করুন। এই কোয়ার্টারকে পাঁচতলা করে দেন, আমরা আপনাকে সমর্থন দেবো।’
মানববন্ধনে হরিজন সম্প্রদায়ের মনি রানী বলেন, ‘আমি এখানে ডেইলি বেসিসে আউটসোর্সিংয়ে চাকরি করি। আমাদের সরকারি চাকরি নেই। যে বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না। আবার তিন মাস, চার মাস, কখনো ছয় মাস পর বেতন পাই। তারপরও আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। যেভাবেই হোক বেঁচে আছি। কিন্তু এরপরও কেন আমাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে? আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষ এখানে মারা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগেও আমরা এখানে ছিলাম।’
নিজেদের পেশা ও পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে মনি রানী বলেন, ‘আমরা হরিজন হয়ে জন্মেছি বলে কি পাপ করেছি? আমাদের কোনো পাপ নেই। আমরা সবার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করি, সবাইকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্নভাবে বসবাস করার সুযোগ করে দিই। তারপরও কেন আমাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে?’
উচ্ছেদ বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই উচ্ছেদের খেলা বন্ধ করুন। হরিজনরা যেসব জায়গায় বসবাস করে, আর কাউকে উচ্ছেদ করার কথা যেন না আসে। এটাই আমাদের শেষ কথা।’
এর আগে গত ৪ আগস্ট স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল এ টি এম এ রুস্তমের সই করা নোটিশে মিনিয়ালস কোয়ার্টারসহ (সুইপার কলোনি) বেশকিছু পুরনো স্থাপনা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। নোটিশে ৩০ আগস্টের মধ্যে ভবন খালি করার নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়, অন্যথায় সব ধরনের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।
