নেপালের রসুয়া জেলায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যায় ৫১৭ বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ থাকায় কয়েকটি দেশের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে সরকার। তারা বলেছে, নেপালের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই এ অভিযান পরিচালনায় সক্ষম।
বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উদ্ধারকারী দল পাঠানোর পরিবর্তে একক ব্যবস্থার মাধ্যমে নগদ সহায়তা চায় নেপাল। কর্মকর্তারা বলছেন, পুনর্গঠনপর্বে আরও আর্থিক সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতা চাওয়া হবে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। আরও কয়েকটি দেশ অনুসন্ধান, উদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে নেপালকে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে ১৭৮ ভারতীয়, ৬৫ মার্কিন, ৫১ মালয়েশীয়, ৫৩ ইউক্রেনীয়, ৩৩ ব্রিটিশ, ৩৫ অস্ট্রেলীয়, ২৫ কানাডীয় এবং আরও প্রায় ৩৬টি দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনা কর্মকর্তারা জানান, নেপালে অন্তত ১০০ চীনা নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যায় আটকে পড়া ২০০ জনের বেশি ভারতীয় নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে নিজেদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর জন্য একাধিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ পেয়েছে সরকার। তবে সরকার তাদের জানিয়েছে, নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই এই অভিযান পরিচালনায় সক্ষম।
ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের কর্মকর্তারা অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে কাজের অনুমতি দিতে নেপাল সরকারকে অনুরোধ করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার পর সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেসময় বিদেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলের ব্যাপক উপস্থিতি এবং দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা হয়েছিল। নেপাল সেনাবাহিনী ও পুলিশের সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বন্যার পর ভারতের শত শত নাগরিক নিখোঁজ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দেশটির সরকার নেপালে তাদের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স মোতায়েনের অনুমতি চেয়েছিল। নেপাল সরকার সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, চীন ও অন্যান্য দেশ থেকেও একই ধরনের অনুরোধ পেয়েছি। তবে আমাদের সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছে।
অন্যদিকে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি নাগরিকদের সহায়তায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করেছে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত, নিখোঁজ বা অন্য কোনোভাবে এই বন্যার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি নাগরিকদের অনুসন্ধান, উদ্ধার, তথ্য যাচাই ও কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করতে ইআরটি মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একটি দল ইআরটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর পাউডিল ছেত্রী বলেন, নিখোঁজ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান ও পরিস্থিতি জানতে মন্ত্রণালয় একজন উপসচিবকে তিমুরে (রসুয়া) বিশেষায়িত অপারেশন দলে পাঠিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উপসচিব মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছেন এবং তিনি যে তথ্য সংগ্রহ করবেন, তা সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। কারণ তাদের স্বজনদের কাছ থেকে আমরা বিপুলসংখ্যক তথ্য জানতে চেয়ে যোগাযোগ পেয়েছি।
মুখপাত্র বলেন, এটি একটি একক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের স্বজনেরা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন। রসুয়ার আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বা নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত হটলাইন ও ই-মেইলে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্বে থাকা যুগ্ম সচিবদের বিদেশি সরকারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং তাদের নিখোঁজ নাগরিকদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।
মন্ত্রণালয় বিদেশে থাকা তাদের মিশনগুলোকে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা চাইতে নির্দেশ দিয়েছে।
ভারত বৃহস্পতিবার নেপালে ৪৭ দশমিক ৫ টনের বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তিনি বলেন, ভারত বেইলি ব্রিজ ও প্রিফ্যাব ট্রাস ব্রিজ পাঠানোরও প্রস্তাব দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নেপাল যে অনুরোধ করেছে, আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছেন, এডিবি নেপাল ও দেশটির জনগণের পাশে রয়েছে।
তিনি লিখেছেন, তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তার পাশাপাশি, উন্নত ঝুঁকি মূল্যায়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং আরও স্থিতিস্থাপক অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা জোরদারে আমরা নেপালকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখব, যাতে মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক্সে বলেছেন, মানবিক সহায়তা দিয়ে নেপাল সরকারকে সহযোগিতা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের কাছ থেকেও ফোন পেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খানাল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মিলিব্যান্ড নেপালের প্রতি যুক্তরাজ্য সরকারের দৃঢ় সমর্থনের কথা জানান এবং নিখোঁজ ব্রিটিশ নাগরিকদের সন্ধানসহ চলমান উদ্ধার তৎপরতার বিষয়ে খোঁজ নেন।
বিদেশে নেপালের মিশনগুলোও একই ধরনের বিবৃতি দিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনে আর্থিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
