যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সোনোমা থেকে সান ফ্রান্সিসকোর দিকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। প্রশান্ত মহাসাগরের পাশ দিয়ে এগোতে থাকলে হঠাৎ চোখে পড়বে দুটি গম্বুজওয়ালা ছোট্ট একটি গির্জা। গির্জার মাথায় অর্থোডক্স ক্রুশ, পাশেই সাইরিলিক হরফে লেখা একটি সাইনবোর্ড। একটু এগোলেই পাহাড়ের কিনারায় দেখা যাবে কাঠের তৈরি পুরোনো দুর্গের মতো একটি স্থাপনা।
এটাই ফোর্ট রস। রুশ ভাষায় যার নাম ‘ক্রেপস্ত রস’।
ক্যালিফোর্নিয়ার এই প্রত্যন্ত উপকূলের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের কথা আজ অনেকেই জানেন না। অথচ প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানকার একটি অংশ রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ১৮১২ থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশদের একটি স্থায়ী উপনিবেশ ছিল। এটি ছিল রাশিয়ার উত্তর আমেরিকান উপনিবেশগুলোর অংশ, যা তখন ‘রাশিয়ান আমেরিকা’ নামে পরিচিত ছিল বলে জানায় বিবিসি।
ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে স্প্যানিশ ও মেক্সিকান শাসনের কথা বেশি পরিচিত হলেও রুশদের এই অধ্যায়টি অনেকটাই বিস্মৃত। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির নৃবিজ্ঞানী কেন্ট লাইটফুট বিবিসিকে বলেন, বেশির ভাগ ক্যালিফোর্নিয়াবাসীও জানেন না যে একসময় এখানে রাশিয়ার উপনিবেশ ছিল। এটি যেন একটি ‘ভুলে যাওয়া সাম্রাজ্য’।
১৬০০ ও ১৭০০-এর দশকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন পশ্চিম দিকে নিজেদের উপনিবেশ বিস্তার করছিল, রাশিয়া তখন পূর্ব দিকে এগোচ্ছিল। ১৬৪০-এর দশকের মধ্যেই রুশ পশম ব্যবসায়ী ও ভাড়াটে যোদ্ধারা সাইবেরিয়া পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছে যায়।
এরপর আলাস্কার বিভিন্ন দ্বীপ ও উপকূলে রুশ বসতি গড়ে ওঠে। ১৭৯৯ সালে জার পল রুশ-আমেরিকান কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আলাস্কার ওপর রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
রুশ-আমেরিকান কোম্পানি মূলত পশমের ব্যবসা করত এবং আলাস্কাকে একটি বাণিজ্যিক উপনিবেশ হিসেবে পরিচালনা করত। সমুদ্রভোঁদড়ের চামড়ার ব্যবসা থেকে তারা ভালো লাভও করছিল।
কিন্তু আলাস্কায় তাদের বড় সমস্যা ছিল খাদ্য। সেখানকার ঠান্ডা আবহাওয়ায় কৃষিকাজ করা কঠিন ছিল। ফলে আলাস্কায় থাকা রুশ ও তাদের সঙ্গে কাজ করা মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছিল না।
তাই রুশরা এমন একটি জায়গা খুঁজতে থাকে, যেখানে আবহাওয়া উষ্ণ, কৃষিকাজ করা সহজ এবং আলাস্কার সঙ্গে খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
এই খোঁজেই তাদের নজর পড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে।
১৮০৬ সালের এপ্রিলে রুশ-আমেরিকান কোম্পানির পরিচালক নিকোলাই রেজানোভ তার জাহাজ ‘জুনো’ নিয়ে সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরে প্রবেশ করেন। তখন আলাস্কার রুশ বসতিগুলোতে খাদ্যসংকট তীব্র ছিল। তার নাবিকদের অনেকেই স্কার্ভিতে আক্রান্ত ছিলেন বলে জানায় বিবিসি।
সে সময় ক্যালিফোর্নিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছিল স্প্যানিশদের হাতে। রেজানোভ প্রায় ছয় সপ্তাহ সান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থান করেন এবং স্প্যানিশদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করেন। সেখানে তার সঙ্গে স্প্যানিশ কমান্ড্যান্টের ১৫ বছর বয়সী মেয়ের বাগদানও হয়।
ফিরে যাওয়ার সময় রেজানোভ উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলের দিকে নজর দেন। তিনি দেখেন, জায়গাটি আলাস্কার তুলনায় অনেক উষ্ণ এবং কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। অন্যদিকে এই অঞ্চলে স্প্যানিশদের উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে কম।
তখন রুশদের মনে হলো, এখানে একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা গেলে একদিকে খাবার উৎপাদন করা যাবে, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে রাশিয়ার বাণিজ্যিক উপস্থিতিও বাড়ানো সম্ভব হবে।
বিবিসি জানায়, এই পরিকল্পনার ফলেই ১৮১২ সালে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে একটি রুশ বসতি তৈরি করা হয়। প্রথম দিকে সেখানে ২৫ জন রুশ এবং প্রায় ৮০ জন স্থানীয় আলাস্কান শিকারি ছিলেন। প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে থাকা এই বসতিই পরে ফোর্ট রস নামে পরিচিত হয়।
তবে ফোর্ট রস শুধু একটি সামরিক দুর্গ ছিল না। সময়ের সঙ্গে এটি একটি ছোট কিন্তু ব্যস্ত বহুজাতিক বাণিজ্যিক ও উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
রুশ-আমেরিকান কোম্পানির কর্মকর্তারা ফোর্ট রসের মূল দুর্গে থাকতেন। কিন্তু দুর্গের আশপাশে ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। ১৮৩০-এর দশকেও এখানে প্রায় ৪০০ মানুষ বসবাস করতেন বলে বিবিসি জানায়।
এখানে শুধু রুশরা ছিলেন না। আলাস্কা থেকে আসা আলেউত ও কোডিয়াক শিকারিদের পাশাপাশি স্থানীয় ক্যালিফোর্নিয়ার নারীরাও বসবাস করতেন। তাদের মধ্যে অনেকের বিয়ে ও পরিবারও গড়ে উঠেছিল।
একইভাবে, রুশ ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত পুরুষদের সঙ্গেও স্থানীয় কাশায়া পোমো ও কোস্ট মিউক জনগোষ্ঠীর নারীদের বিয়ে ও পরিবার গড়ে ওঠে।
অর্থাৎ, ফোর্ট রসে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ শুধু পাশাপাশি বসবাসই করতেন না, তাদের মধ্যে বিয়ে, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগও তৈরি হয়েছিল। এমনকি মৃত্যুর পরও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে একই কবরস্থানে সমাহিত করা হতো।
ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট পার্কসের প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রিস কিমসি বিবিসিকে বলেন, অন্য অনেক ইউরোপীয় উপনিবেশের তুলনায় রুশদের এই বসতি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল। রুশরা এখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ‘সভ্য’ করার উদ্দেশ্যে বসতি গড়েনি।
ফোর্ট রসে শুধু স্থানীয় ও রুশরাই ছিলেন না। ফিনল্যান্ড ও হাওয়াইয়ের মতো দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও কাঠমিস্ত্রি, কামার ও অন্যান্য দক্ষ কারিগর এখানে এসে কাজ করতে আসতেন।
ফোর্ট রস ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
এখানেই ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মিত হয়। তৈরি করা হতো ইট ও কাচ। ছিল বাতাসচালিত কলও।
অর্থাৎ, রুশদের এই ছোট উপনিবেশ শুধু খাবার উৎপাদনের জায়গা ছিল না, এখানে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ও উৎপাদন কর্মকাণ্ডও চলত।
রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল আরও বড়
ফোর্ট রসকে কেন্দ্র করে রুশ-আমেরিকান কোম্পানির উচ্চাকাঙ্ক্ষাও বাড়তে থাকে। বাণিজ্যের পাশাপাশি তারা উত্তর আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে রাশিয়ার প্রভাব আরও বিস্তারের কথাও ভাবছিল।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ১৮২১ সালে জার আলেকজান্ডার প্রথম আধুনিক ওরেগন থেকে আলাস্কা পর্যন্ত বিশাল এলাকার ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে একটি সাম্রাজ্যিক ফরমান জারি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সি অ্যাডামস এর বিরোধিতা করেন। তার বক্তব্য ছিল, আমেরিকা মহাদেশে আর নতুন কোনো ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।
এই বিরোধ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ মনরো নীতিও গড়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা রাখে।
ফোর্ট রসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার ছিল কৃষি। ১৮১৪ সালে রুশরা সেখানে একটি পীচগাছ দিয়ে বাগান শুরু করে। পরে বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফসল চাষ করা হয়।
সোনোমার সরকারি ওয়াইন লাইব্রেরিয়ান মেগান জোনসের মতে, ১৮১৭ সালে বর্তমান সোনোমা কাউন্টিতে প্রথম আঙুরগাছ রোপণ করেন রুশরা।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া ‘মিশন’ জাতের আঙুর দিয়ে তারা অল্প পরিমাণে হালকা লাল ওয়াইনও তৈরি করত।
আজ সোনোমাকে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ওয়াইন শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই ইতিহাসের শুরুর দিকেও রুশদের এই ছোট উপনিবেশের ভূমিকা ছিল।
এত কিছু করার পরও ফোর্ট রস রুশ-আমেরিকান কোম্পানির প্রধান দুটি লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি বলে জানায় বিবিসি।
প্রথমত, এটি প্রত্যাশিত মাত্রায় লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, আলাস্কার রুশ বসতিগুলোতে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ করাও সম্ভব হয়নি।
এর একটি কারণ ছিল অতিরিক্ত শিকার। ১৮২০-এর দশকের শুরুতেই রুশ-আমেরিকান কোম্পানির শিকারিরা এত বেশি সমুদ্রভোঁদড় শিকার করেন যে স্থানীয়ভাবে এই প্রাণীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়।
কৃষিতেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। উপকূলের ঘন কুয়াশা ও ইঁদুরের উপদ্রব ফসল উৎপাদনে সমস্যা তৈরি করেছিল। ১৮২৬ থেকে ১৮৩৩ সালের মধ্যে বছরে গড়ে মাত্র ১৩ টন গম উৎপাদিত হতো বলে জানায় বিবিসি।
ফলে ফোর্ট রসকে ঘিরে রাশিয়ার বড় পরিকল্পনা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ মালিকানাধীন হাডসনস বে কোম্পানি প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে রুশ আলাস্কায় খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে রাজি হয়।
এর ফলে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজস্ব কৃষি ও উৎপাদনের মাধ্যমে আলাস্কার খাবারের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয়তা রুশদের কাছে অনেকটাই কমে যায়।
১৮৪১ সালে সুইস অভিবাসী জন সাটার রুশদের কাছ থেকে ফোর্ট রসের ভবন ও অন্যান্য সম্পদ ৩০ হাজার ডলারে কিনে নেন। পরে তিনি সেগুলোর কিছু অংশ খুলে নিয়ে স্যাক্রামেন্টোতে নিজের নতুন বসতি তৈরিতে ব্যবহার করেন।
এর মধ্য দিয়েই ক্যালিফোর্নিয়ায় রুশ উপনিবেশের অধ্যায়ের শেষ হয়।
তবে রুশরা চলে যাওয়ার পরও জায়গাটি ইতিহাসের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ফোর্ট রস বিক্রির সাত বছর পর জন সাটারের জমিতে সোনা আবিষ্কৃত হয়। শুরু হয় ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত গোল্ড রাশ, যা পরবর্তী সময়ে পুরো অঞ্চলের ইতিহাস বদলে দেয়।
রাশিয়ার সেই বিস্মৃত অধ্যায়ের চিহ্ন এখনো ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। সান ফ্রান্সিসকোর বিখ্যাত রুশ হিল এলাকার নামের সঙ্গে রুশ-আমেরিকান কোম্পানির নাবিকদের সমাধির সম্পর্ক রয়েছে।
বডেগা বে-তেও রুশদের উপস্থিতির ঐতিহাসিক চিহ্ন রয়েছে। এখান থেকেই তারা রুশ আলাস্কার রাজধানী নভো-আরখানগেলস্কের দিকে যাত্রা করত।
আর সান ফ্রান্সিসকোর উত্তরে রুশ রিভার ভ্যালি এখন ক্যালিফোর্নিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন ও ওয়াইন অঞ্চল। প্রতি বছর ১০ লাখের বেশি মানুষ সেখানে যান, নদীতে সময় কাটান এবং ওয়াইন উপভোগ করেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই নদীর রুশ নাম ছিল ‘স্লাভিয়াঙ্কা’। স্থানীয় কাশায়া পোমো জনগোষ্ঠীর বংশধর সুকি ওয়াটার্স বলেন, রুশরা নদীটিকে তাদের এলাকার অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ হিসেবে ব্যবহার করত।
আজ ফোর্ট রস অনেকটাই নির্জন। নিকটতম শহর এবং মোবাইল ফোনের সেবা থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থানে প্রতিদিন খুব বেশি দর্শনার্থীও আসেন না।
তবু প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে থাকা কাঠের পুরোনো স্থাপনা, অর্থোডক্স গির্জা এবং সাইরিলিক লেখা যেন ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসের একটি ভুলে যাওয়া অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাস শুধু স্প্যানিশ, মেক্সিকান কিংবা আমেরিকানদের গল্প নয়। প্রায় দুই শতাব্দী আগেও এখানে রাশিয়ার একটি ছোট উপনিবেশ ছিল।
