অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে সোমবার রাতে ১-০ গোলের জয়টি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ক্লাবটির সুদীর্ঘ ইতিহাসে কোচ মিকেল আর্তেতার নামও উঠে গেছে এক বিরল উচ্চতায়। গানারদের ডাগআউটে এটি ছিল তার ২৫০তম প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচ।
আর্সেনালকে ২২ বছর পর অধরা লিগ শিরোপা জেতানো এই স্প্যানিয়ার্ড এখন কোনো নির্দিষ্ট প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবের হয়ে ২৫০ বা তার বেশি ম্যাচ পরিচালনা করা মাত্র দশম ম্যানেজার। ভিলা পার্কে ম্যাচ শেষে সফরকারী সমর্থকরা যখন আর্তেতার অধীনে আবারও লিগ জয়ের সম্ভাবনার গান গাইছিল, তখন এই পরিসংখ্যান তাদের সেই আশার পালে জোর হাওয়া দিয়েছে।
অভিজাত ক্লাবে আর্তেতার দুর্দান্ত পরিসংখ্যান
২৫০ ম্যাচের এই অভিজাত ক্লাবে নাম লিখিয়ে কেবল সংখ্যাতেই আটকে থাকেননি সাবেক মিডফিল্ডার আর্তেতা। জয়ের শতকরা হারের দিক থেকেও তিনি প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের সফলতম কোচেদের কাঁধে কাঁধ মেলাচ্ছেন। ১০ জনের এই তালিকায় তার জয়ের হার ৬০.৪ শতাংশ, যা তাকে বসিয়েছে ঠিক চার নম্বরে। ২৫০ ম্যাচে ১৫১টি জয়, ৪৮টি ড্র ও ৫১টি হার রয়েছে তার নামের পাশে।
জয়ের শতকরা হারের দিক থেকে আর্তেতার সামনে রয়েছেন কেবল তিনজন। তারা হলেন— ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা (৭০.৮%), ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন (৬৫.২%) ও লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ (৬২.৬%)। এমনকি আর্সেনালের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ও কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারকেও পেছনে ফেলেছেন আর্তেতা। প্রিমিয়ার লিগে ৮২৮ ম্যাচে দল পরিচালনা করে ৫৭.৫ শতাংশ জয় পেয়েছিলেন সাবেক কোচ ওয়েঙ্গার।
এই তালিকায় থাকা ডেভিড ময়েস, হ্যারি রেডন্যাপ বা শন ডাইচদের মতো অভিজ্ঞ নামগুলো আর্তেতার চেয়ে বহুদূরে পিছিয়ে আছেন। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কোচের দায়িত্বে থাকা এই স্প্যানিশ আর্সেনালকে একটি নির্দিষ্ট ও শক্তিশালী পরিচয় এনে দিয়েছেন।
রক্ষণভাগের দুর্ভেদ্য দেয়াল
আর্সেনালের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় সাত বছরে পুরো দলের চালচিত্রই বদলে দিয়েছেন আর্তেতা। বিশেষ করে, গানারদের রক্ষণভাগকে তিনি পরিণত করেছেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গে।
ভিলা পার্কের সাম্প্রতিক ম্যাচেও এর পূর্ণ প্রতিফলন দেখা গেছে, যেখানে বুকায়ো সাকার দ্বিতীয়ার্ধের গোলটি জয়ের ভিত্তি গড়ে দিলেও মূল স্তম্ভ ছিল তাদের জমাট ডিফেন্স। পুরো নব্বই মিনিটে অ্যাস্টন ভিলাকে একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে দেয়নি আর্তেতার শিষ্যরা।
চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে খেলা প্রথম দুই ম্যাচে প্রতিপক্ষকে মাত্র তিনটি শট লক্ষ্যে নিতে দিয়েছে গানাররা। এমনকি গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে তারা ছয়টি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কোনো শটই লক্ষ্যে রাখতে দেয়নি, যা ২০০৩-০৪ মৌসুমের পর এই লিগে সর্বোচ্চ।
রক্ষণের এই ধারাবাহিকতার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে গোলরক্ষক দাভিদ রায়ার। তিনি টানা তিন মৌসুম প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে বেশি ক্লিন শিট রেখে গোল্ডেন গ্লাভস জয় করেছেন। একইসঙ্গে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে উইলিয়াম সালিবা ও গ্যাব্রিয়েল টানা তিন বছর পিএফএ বর্ষসেরা একাদশে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
দলের এমন সুসংগঠিত পারফরম্যান্সের প্রশংসায় আর্সেনালের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা থিয়েরি অঁরি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই স্পোর্টসকে বলেন, ‘তারা যেভাবে দল হিসেবে রক্ষণ সামলায় এবং দল হিসেবে আক্রমণ করে, তা অসাধারণ। আর্সেনালে একটি বিষয় নিশ্চিত— সবাইকে দৌড়াতে হবে। এই দলে অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো সুযোগ কারও নেই। শিরোপা এভাবেই জিততে হয় এবং আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন তারা এতে কতটা দক্ষ।’
স্কোয়াডের গভীরতা ও টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন
আর্সেনালের সাজঘরে আর্তেতার সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত পরিকল্পনার কথা নতুন করে আসা খেলোয়াড়রা প্রায়ই বলে থাকেন। মাঠের ভেতরের কড়া শৃঙ্খলা ও বিস্তারিত কৌশলই এখনকার দলটিকে বিশেষত্ব দিয়েছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষও কোচের ওপর শতভাগ আস্থা রেখে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
গত গ্রীষ্মে ২৫ কোটি পাউন্ড খরচ করে আটজন নতুন মুখ দলে এনেছিল গানাররা। আর চলতি মৌসুমেও এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ কোটি পাউন্ডের দলবদল সেরেছে প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নরা।
ধারে আসা পিয়েরে হিনকাপিয়ের চুক্তিকে ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ডে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পাশাপাশি নিউক্যাসল থেকে ব্রুনো গিমারায়েস (৭ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড), অ্যাস্টন ভিলা থেকে এজরি কনসা (৫ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড) ও ক্লাব ব্রুগ থেকে ক্রিস্টোস জোলিসকে (৩ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড) দলে ভিড়িয়ে স্কোয়াডের গভীরতা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে।
শিরোপাপ্রত্যাশী ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যখন দলীয় পুনর্গঠন ও পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন আর্তেতা ইতোমধ্যে আর্সেনালকে সুনির্দিষ্ট কাঠামো দিয়ে রেখেছেন।
২৫০তম ম্যাচ শেষে আর্তেতা নিজেই স্কোয়াডের গভীরতা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। স্কাই স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘ঠিক এই জিনিসটাই আমাদের প্রয়োজন। বদলি হিসেবে মাঠে নামা খেলোয়াড়রা পার্থক্য তৈরি করে দিচ্ছে। তারা সবাই ম্যাচে দলের নিয়ন্ত্রণ ও গতি বাড়াতে অবদান রাখছে। তাদের যে ধরনের মনোযোগ এবং দলের জন্য অবদান রাখার মানসিকতা দেখা যাচ্ছে, চলতি মৌসুমে সেটাই হবে আসল নির্ণায়ক।’
