‘নিজের লোকের’ জন্য বিনা প্রশ্নে ছাড়?

অপ্রত্যাশিতটাই প্রত্যাশা করুন। এটাই যেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অলিখিত নীতিবাক্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউটার্ন, খোঁড়া যুক্তি, আর নিজের প্রক্রিয়ার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক ‘প্রক্রিয়া মেনে চলার’ দাবি—এসবে আর অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) কথাই ধরুন। খেলোয়াড়দের স্বার্থ রক্ষার নামে তৈরি এই সংগঠনটি এখন নিজেই আলোচনার কেন্দ্রে।

বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের এবারের বিপিএল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কোয়াবের সদস্যরা শুরুতে কিছুটা আপত্তি তুললেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছেন—এই দৃশ্যটাই কেমন যেন খাপছাড়া লাগে।

অথচ এই খেলোয়াড়রাই, কোয়াবের ব্যানারে না হলেও তামিমের নেতৃত্বেই, সাবেক বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ ও আমিনুল ইসলাম বুলবুলের আমলে বিপিএল মাঠে গড়ানোর জন্য মরিয়া ছিলেন।

জুলাইয়ের পালাবদলের রেশ কাটতে না কাটতেই, ফারুক সভাপতির চেয়ারে বসার মাসখানেকের মধ্যে তামিমের নেতৃত্বে একদল খেলোয়াড় তার কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন—বিপিএল যেন স্থগিত না হয়।

আয় কমিয়ে হলেও টুর্নামেন্টটা যাতে হয়, সেই আপসেও রাজি ছিলেন খেলোয়াড়রা। দেশ আর বিসিবি তখনো ২০২৪-এর অভ্যুত্থান-উত্তর টালমাটাল অবস্থায়, তবু বিতর্কমুক্ত একটা বিপিএল আয়োজনের জন্য ফারুককে যথেষ্ট সময় দেওয়ার মানসিকতা তাদের ছিল না বললেই চলে।

এবার তামিম নিজেও প্রায় একই রকম পরিস্থিতির কথা বলে টুর্নামেন্টটা স্থগিত করলেন।

আয়রনিটা এখানেই স্পষ্ট—ফারুকের ওপর তখন এত চাপ তৈরি হলো, আর তামিমের বেলায় সেই একই মাত্রার প্রতিরোধ কোথায়?

বিপিএল তাদের জীবিকার জন্য কতটা জরুরি, খেলোয়াড়রা বরাবরই সে কথা বলে এসেছেন। ২০২৪ সালে মুশফিকুর রহিমও বলেছিলেন, বিপিএল না হলে ‘পরিবারের ভরণপোষণ করাই কঠিন হয়ে পড়বে’।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে—মুশফিকুরের মতো প্রতিষ্ঠিত একজন ক্রিকেটারের জীবিকাও যদি বিপিএল না হওয়ায় প্রভাবিত হয়, তাহলে খেলোয়াড়দের স্বার্থ রক্ষায় যা কার্যকর তেমন কিছুই করে না, এমন একটা সিদ্ধান্তে কোয়াব মাথা নাড়ছে কেন?

এরপরের বিপিএল সংস্করণেই বিসিবির গরম চেয়ারে বসেন আরেক সাবেক অধিনায়ক। বিপিএলের সমালোচনায় সবসময় সরব বুলবুলও শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন।

পূর্ণাঙ্গ বোর্ড ছাড়াই কিছুদিন বিসিবি চালানোর পর সরাসরি সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বুলবুল নিজেই হয়ে যান বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের প্রধান। ফল যা দাঁড়াল, ২০১২ সালে টুর্নামেন্টের যাত্রা শুরুর পর থেকে সম্ভবত সবচেয়ে বিশৃঙ্খল সংস্করণ।

এম নাজমুল ইসলাম প্রকাশ্যে সিনিয়র খেলোয়াড় তামিমকে ‘ভারতীয় দালাল’ বলে কটাক্ষ করেন। খেলোয়াড়দের পেছনে পেছনে টাকা খরচ নিয়ে চরম আপত্তিকর মন্তব্য করে, এতে খেলোয়াড়রা প্রতিবাদে নামেন, ম্যাচ বয়কট পর্যন্ত করেন।

এবার কিন্তু বিপিএল হচ্ছে না। বিকল্প কোনো টুর্নামেন্টও থাকছে না। খেলোয়াড়রা বদলে একটা আলাদা টুর্নামেন্ট চেয়েছিলেন, তামিম সেটাও নাকচ করে দিয়েছেন।

কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন মঙ্গলবার তামিমের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘বোর্ড আমাদের জানিয়েছে, তারা এমন একটা মডেল তৈরি করছে যা দীর্ঘমেয়াদে ৫০-৬০ জন নয়, ১৮০-২০০ জন ক্রিকেটার উপকৃত হবেন এমন একটা কাঠামো দাঁড় করাবে। তাই আমরা বোর্ডের পরিকল্পনার ওপর ভরসা রাখছি।’

তাহলে প্রশ্ন হলো—কোয়াবের ছাতার নিচে থাকা এই খেলোয়াড়রা হঠাৎ বোর্ডের পরিকল্পনায় এত ভরসা করতে শিখলেন কীভাবে? ফারুক আর বুলবুলকে চাপে রেখে বিপিএল মাঠে নামানো নিশ্চিত করেছিলেন যারা, আরেক সাবেক অধিনায়ক তামিমের বেলায় এই বাড়তি খাতির কেন?

দর কষাকষির শক্তি দিয়ে খেলোয়াড়দের পক্ষে ভালো ফল বের করে আনাই তো কোয়াবের কাজ। কিন্তু বাস্তবে সেই ভূমিকা পালনে সংগঠনটি প্রায় সবসময়ই ব্যর্থ।

২০১৯ সালে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিতে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় বিদ্রোহের সময়ও খেলোয়াড়রা কোয়াবের ব্যানারে সেটা করেননি। খেলোয়াড়দের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটা স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হওয়ার কথা এই সংগঠনটির, অথচ বরাবরই যেন প্রতিষ্ঠানের সুরেই সুর মিলিয়ে চলেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম মনে হচ্ছে না।

এটা কারও অজানা নয় যে, তামিমের আশীর্বাদেই কোয়াবের সাম্প্রতিক কমিটি গঠিত হয়েছে। তার বিপিএল-সিদ্ধান্তে প্রতিরোধের এই ঘাটতির একটা ব্যাখ্যা হয়তো এখানেই লুকিয়ে।

চুক্তির সুবাদে বিসিবির নিয়মিত বেতনের নিরাপত্তা এখন উপভোগ করছেন প্রায় ১৩৩ জন ক্রিকেটার—২৮ জন কেন্দ্রীয় চুক্তিতে, ১০৫ জন প্রথম শ্রেণির চুক্তিতে। কিন্তু এর বাইরে অনেক বড় একটা বলয় এখনো নির্ভর করে টুর্নামেন্টের সুযোগ আর ম্যাচ ফির ওপর।

বিপিএলের অভাব পূরণে বোর্ড বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে বাড়তি ম্যাচ ফি-সহ জাতীয় ক্রিকেট লিগ টি-টোয়েন্টি। কিন্তু ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বিপিএল থেকে যা আয় হতো, তার ধারেকাছেও এটা যাবে বলে মনে হয় না।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের একের পর এক সংস্করণে খেলোয়াড়রা আগের মতো পারিশ্রমিক পেতে হিমশিম খেয়েছেন। এখন আরেকটা বড় আয়ের উৎস হাতছাড়া হওয়াটা তাই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

তামিম অবশ্য নিজের অবস্থানে অনড়—পুরোপুরি সংস্কার ছাড়া বিপিএল নয়।

আর্থিক অনিয়ম, ফিক্সিংয়ের অভিযোগ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক না দেওয়া পর্যন্ত নানা বিতর্কে জর্জরিত থেকেছে এই টুর্নামেন্ট, তাতে সন্দেহ নেই। তবু, নিজেকে তুলে ধরার আর বড় অঙ্কের আয়ের সবচেয়ে লোভনীয় মঞ্চ হিসেবে খেলোয়াড়দের কাছে এখনো এটাই সবার ওপরে।

তামিমের এই অনীহায় আরেকটা আয়রনি লুকিয়ে আছে। যে সভাপতিদের ওপর চাপ দিয়ে তামিম আর খেলোয়াড়রা বিপিএল আয়োজন করিয়েছিলেন, শেষমেশ তাদেরই এর মাশুল গুনতে হয়েছিল।

বিসিবি থেকে ফারুকের বিদায়ের পেছনে টুর্নামেন্টের দুর্বল আয়োজনও একটা কারণ ছিল বলে মনে করা হয়। বুলবুলও একই রকম চাপে পড়েছিলেন এমন এক সংস্করণের দায় মাথায় নিয়ে, যা বাংলাদেশ ক্রিকেটের সুনামকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলেছিল।

তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই হয়তো তামিম এবার সেই ফাঁদ এড়াতে চাইছেন—বিপিএলের দুর্বলতাগুলো যেন নিজের নেতৃত্বের গায়েই আঁচড় না কাটে।

কিন্তু তাতে খেলোয়াড়দের সামনের প্রশ্নটার জবাব মেলে না। পরিস্থিতি এর চেয়েও কঠিন থাকা অবস্থায় দুই অনিচ্ছুক বিসিবি সভাপতিকে যদি তারা বিপিএল আয়োজনে বাধ্য করতে পারেন, তাহলে নিজেদেরই একজন, তাদের সাবেক নেতা যখন ‘না’ বলছেন, তখন খেলোয়াড়দের প্রতিরোধ হঠাৎ এত নমনীয় হয়ে গেল কেন?

কোয়াবের কাজ তামিমকে সমালোচনা থেকে বাঁচানো নয়, খেলোয়াড়দের স্বার্থ রক্ষা করা। খেলোয়াড়দের এই মেনে নেওয়ার প্রবণতাই এখন একটা সহজ অথচ অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—সভাপতির চেয়ারে কে বসে আছেন, তার ওপরই কি নির্ভর করে কোয়াবের প্রতিরোধের মাত্রা?

 

Related Articles

Latest Posts