বাংলাদেশের ইলিশ গেল কোথায়?

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জের জেলে সিদ্দিক মাঝির কাছে ইলিশ কমে যাওয়ার বিষয়টি কোনো পরিসংখ্যান নয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে নৌকায় মাছ ধরতে গিয়ে চোখের সামনে এই পরিবর্তন দেখেছেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টারকে সিদ্দিক বলেন, ‘তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইলিশ ধরছি। কিন্তু গত সাত-আট বছরে ধীরে ধীরে ইলিশের পরিমাণ কমে গেছে।’

ইলিশের মৌসুমে একসময় নদীর মোহনা ও উপকূলের অগভীর পানিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় জেলেরা যেসব জায়গায় জাল ফেলতেন, সেসব এলাকায় তখন থাকত ইলিশের প্রাচুর্য। অগভীর পানিতে একসময় সহজেই বড় আকারের ইলিশ পাওয়া গেলেও এখন তা খুবই কঠিন।

তবে ইলিশ একেবারে হারিয়ে গেছে বলে মনে করেন না সিদ্দিক।

তিনি বলেন, ‘গভীর সাগরে প্রচুর ইলিশ আছে, কিন্তু তারা ওপরে আসে না। আসল প্রশ্ন হলো, মাছগুলো এখন আর ২০ থেকে ৪০ ফুট গভীর পানির স্তরে থাকতে চায় না কেন?’

সিদ্দিকের এই পর্যবেক্ষণই বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশকে ঘিরে তৈরি হওয়া মূল প্রশ্নটিকে সামনে আনে। বঙ্গোপসাগরে ইলিশ হয়তো এখনো আছে, কিন্তু জেলেরা কোথায় গিয়ে তা ধরতে পারবেন, সেই জায়গা বদলে যাচ্ছে। নদী ও ইলিশের প্রজননক্ষেত্র নিয়ে গবেষণাতেও ইঙ্গিত মিলছে, শুধু মাছ ধরার জায়গাই নয়, পুরো মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন রেকর্ড প্রায় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। তবে পরের দুই বছরে উৎপাদন প্রায় ১২ দশমিক পাঁচ শতাংশ কমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয়ভাবে ইলিশের আহরণ নেমে আসে প্রায় পাঁচ লাখ টনে, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইলিশের আহরণ প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যায় বলে জানা গেছে।

ইলিশ কি সাগরের আরও গভীরে চলে যাচ্ছে?

সিদ্দিকের মনে আছে, একসময় নদীর মোহনার কাছেই ইলিশ ধরা পড়ত। এখন মাছ ধরতে জেলেদের সাগরের আরও গভীরে যেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘নদীর মোহনা থেকে ২০, ৩০ বা ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে যেখানে আগে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত, এখন সেখানে আর সেই মাছ নেই। আগে বড় বড় ইলিশ পেতাম, এখন আর পাই না।’

তবে উপকূল থেকে আরও দূরে, বিশেষ করে ৪০ মিটারের বেশি গভীর পানিতে এখনো প্রচুর ইলিশ রয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু প্রান্তিক জেলেদের অনেকের পক্ষেই এত দূরে গিয়ে মাছ ধরা সম্ভব নয়। তাদের নৌকা ও জাল মূলত অগভীর পানিতে মাছ ধরার উপযোগী।

ইলিশের এই স্থান পরিবর্তনের বড় অর্থনৈতিক প্রভাবও পড়ছে জেলেদের ওপর।

পটুয়াখালীর আরেক জেলে আবুল হোসেন ইলিশের ভরা মৌসুমে ১৪ দিন সাগরে কাটিয়েও মাত্র তিন হাজার টাকা নিয়ে ফিরেছেন। অথচ আগের বছর একই মৌসুমে তিনি আয় করেছিলেন প্রায় এক লাখ টাকা।

ভাগে মাছ ধরেন এমন জেলেদের জন্য একটি ব্যর্থ সমুদ্রযাত্রা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। নৌকার মালিকেরা জাল, বরফ ও খাবারের খরচ বহন করেন। মাছ বিক্রির আয় থেকে এসব খরচ বাদ দেওয়ার পর বাকি অর্থ জেলেদের মধ্যে ভাগ হয়। ফলে মাছ কম পাওয়া শুধু আয় কমিয়ে দেয় না, অনেক সময় জেলেদের ঋণের জালেও ফেলতে পারে।

ইলিশ কমে যাওয়া এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যাই নয়, এটি জেলেদের জীবিকার সংকটেও পরিণত হচ্ছে।

উজানে কী ঘটছে?

পদ্মা নদী নিয়ে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সাগরে জেলেদের যে পরিবর্তন চোখে পড়ছে, উজানেও তার কিছুটা প্রতিফলন রয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. ইয়ামিন হোসেন ২০১৭ সাল থেকে পদ্মায় ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন। ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় তার দল অভিযানে জব্দ করা মাছ পরীক্ষা করে আসছে।

২০২২ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে তাদের পাওয়া অধিকাংশ ইলিশের ওজন ছিল ৩০০ গ্রামের কম। ৬০০ থেকে ৭০০টি ইলিশের নমুনায় ৩০০ গ্রামের বেশি ওজনের মাছ পাওয়া যেত খুব কম, সাধারণত আট-দশটির বেশি নয়।

ড. ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘বড় আকারের ইলিশের উজানে উঠে আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’

ইলিশ ছোট আকারেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠছে, এমন প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত প্রজননক্ষম ইলিশের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। কিন্তু পদ্মায় পরিচালিত গবেষণায় ১৭ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৪০ থেকে ১৫০ গ্রাম ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশও পাওয়া গেছে।

‘এটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি,’ বলেন হোসেন।

তবে ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে মাছটির সামগ্রিক সংখ্যাও কমে গেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের জিনগত বৈচিত্র্য বা সংখ্যায় ধস নেমেছে, এমন কোনো প্রমাণ তারা পাননি।

জিনগত তথ্য অনুযায়ী, অতীতে ইলিশের সংখ্যায় একটি সংকোচন ঘটেছিল। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বরং সংখ্যা বাড়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

আলম বলেন, ‘ইলিশের ওপর কোনো নেতিবাচক জিনগত প্রভাব আমরা পাইনি।’

ইলিশ অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম মাছ। সাগর, মোহনা ও মিঠাপানিতে বসবাস করতে পারে। আলমের ধারণা, সাগরের আরও গভীরে ইলিশের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়টি আচরণগত অভিযোজনের ফল হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এটিকে আচরণগত নমনীয়তা বা অভিযোজন বলা হয়। এর অর্থ হলো, মাছগুলো ধীরে ধীরে আরও গভীর সাগরের দিকে চলে যাচ্ছে।’

চাপের মুখে ইলিশের অভিবাসনপথ

প্রজননের জন্য ইলিশ সাগর থেকে মিঠাপানির দিকে আসে। তাই বাংলাদেশের নদীগুলোর পরিবেশ ও পানিপ্রবাহ ইলিশের জীবনচক্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুই গবেষকই নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া ও পলি জমাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন।

আলম বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং নদীতে চর জেগে ওঠার ফলে পদ্মার ওপর প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে হোসেন বাংলাদেশের নদীগুলোতে ব্যাপক পলি জমার বিষয়টি তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে দ্রুত ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

ইলিশের চলাচলের জন্য নদীতে যে জায়গা প্রয়োজন, সেটিও সংকুচিত হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের একটি জরিপে মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনা ও আশপাশের নদীগুলোতে ইলিশের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে এমন ১৭টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টিই মেঘনা নদীতে।

ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য প্রায় ৩০ ফুট গভীর পানি প্রয়োজন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু ভাটার সময় মোহনার কিছু এলাকায় পানির গভীরতা মাত্র আট থেকে নয় ফুটে নেমে আসে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা। ইলিশের প্রজনন ও চলাচল বৃষ্টিপাত, মিঠাপানির প্রবাহ, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়া এবং বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ইলিশ কখন ও কোথায় চলাচল করবে, তাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

উপকূলীয় আবাসস্থলও চাপের মুখে। হোসেন বলেন, বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বা বাদাবন-সংলগ্ন এলাকায় ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা, কীটনাশক ও বিষের ব্যবহার ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার স্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে।

তিনি বলেন, ‘কোনো বন্য মাছের প্রজনন ব্যাহত হলে বেঁচে থাকার জন্য তারা অন্যত্র চলে যায়।’

তবে ইলিশের জীবনচক্র নিয়ে এখনো বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঘাটতি রয়েছে। আলম বলেন, ইলিশের জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিক কী ধরনের লবণাক্ততা, পানির ঘোলাভাব, তাপমাত্রা ও স্রোত প্রয়োজন, তার সুনির্দিষ্ট সমন্বয় এখনো গবেষকদের জানা নেই।

সংরক্ষণে সাফল্য আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে

ইলিশ রক্ষায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মৌসুমি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এবং সাগরে নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এসব উদ্যোগ যে কাজ করে, তার প্রমাণও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার ফলে বিপুলসংখ্যক প্রজননক্ষম মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়।

তবে জেলেদের অভিযোগ, এসব নিষেধাজ্ঞা সব জায়গায় সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না।

সিদ্দিক বলেন, কুয়াকাটা, পটুয়াখালী ও বরগুনা এলাকার জেলেরা সাধারণত সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন। কিন্তু অন্য এলাকার কিছু নৌকা তখনো মাছ ধরে।

তিনি বলেন, ‘আমি কর্মকর্তাদের বলেছিলাম, যদি ভোলায় মাছ ধরতে দেন, তাহলে আমাদেরও মাছ ধরতে দিন। আর তা না হলে সেখানেও মাছ ধরা বন্ধ করুন।’

ক্ষতিপূরণ নিয়েও রয়েছে সমস্যা। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের চাল দেওয়া হয়। কিন্তু সাক্ষাৎকার দেওয়া জেলেরা বলেছেন, এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয় এবং প্রকৃত জেলেরা সবসময় তা পান না।

যেসব পরিবারকে কয়েক সপ্তাহ আয়হীন থাকতে হয়, তাদের জন্য কার্যকর জীবিকা সুরক্ষা ছাড়া সংরক্ষণ কার্যক্রম মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইলিশ কি আবার ফিরতে পারে?

আশাবাদের কিছু কারণ অবশ্যই আছে।

বাংলাদেশের আগের ইলিশ মৎস্য ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা দেখিয়েছে, লক্ষ্যভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন, মাছের আকার এবং জেলেদের আয়, তিনটিই বাড়ানো সম্ভব।

ড. ইয়ামিন হোসেন মনে করেন, জাটকা রক্ষা এবং প্রজননক্ষম মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া গেলে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে ইলিশের প্রাচুর্য আবার বাড়তে শুরু করতে পারে।

তবে ইলিশ পুনরুদ্ধারে প্রতিবছর কয়েক সপ্তাহ মাছ ধরা বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়।

এজন্য নদীর পানিপ্রবাহ ও ইলিশের চলাচলের পথ পুনরুদ্ধার, উপকূলীয় বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষা, ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা বন্ধ, সব এলাকায় সমানভাবে আইন প্রয়োগ এবং প্রকৃত জেলেদের কাছে ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

এর পাশাপাশি ইলিশ নিয়ে গবেষণাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।

ড. শামসুল আলম বলেন, ‘ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এটি নিয়ে আসলে গবেষণা খুবই কম হয়েছে।’

Related Articles

Latest Posts