২৫ বছরের মার্কিন যুদ্ধে নিহত ৪৫ লাখ, বাস্তুচ্যুত ৩ কোটি ৮০ লাখ

একটি হামলার পর শুরু হয়েছিল যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’, ২৫ বছর পর তার হিসাব দাঁড়িয়েছে লাখো মৃত্যু, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি আর অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষত হিসেবে। আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ থেকে শুরু করে লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় বিমান ও ড্রোন হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব সামরিক অভিযানে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রাণ গেছে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষের। ঘর হারিয়েছেন তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি।

আল জাজিরা বলছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলা চালায়। এতে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন।

এর এক মাসেরও কম সময় পর আফগানিস্তানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ভাষায়, শুরু হয় ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। এরপর আফগানিস্তান, ইরাক এবং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে একের পর এক সামরিক অভিযান চালানো হয়। ২০০১ সালের পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই বিশ্বের কোনো না কোনো দেশে মার্কিন বাহিনী বোমা হামলা চালিয়েছে।

২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় ১৮ বছরের শিক্ষার্থী ছিলেন ওমর। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘সবকিছু বদলে গিয়েছিল।’ ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র (ডব্লিউএমডি) থাকার মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে ইরাকে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল বলে স্মরণ করেন তিনি।

‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ নিহত ৪৫ লাখের বেশি

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আনুমানিক ৪৫ লাখ থেকে ৪৭ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন।

এর মধ্যে প্রায় নয় লাখ ৪০ হাজার মানুষ সরাসরি যুদ্ধের কারণে মারা গেছেন। আর রোগ, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জটিলতার মতো যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ লাখ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ।

আফগানিস্তানে সরাসরি নিহত এক লাখ ৭৬ হাজার

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবান সরকারের পতন হলেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। চার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সময়জুড়ে প্রায় ২০ বছর ধরে চলা এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ হয়ে ওঠে।

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে সরাসরি যুদ্ধের কারণে আনুমানিক এক লাখ ৭৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ক্ষুধা, রোগ ও চিকিৎসার অভাবে আরও কয়েক লাখ মানুষ মারা যান।

যুদ্ধের আগে আফগানিস্তানের ৬২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। যুদ্ধের পর এই হার বেড়ে ৯২ শতাংশে দাঁড়ায়। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ও স্থলমাইন এখনো বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের কারণ হয়ে আছে।

২০২১ সালে আবারও আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান।

ইরাকে সরাসরি নিহত তিন লাখ ১৫ হাজার

এর দুই বছরেরও কম সময় পর, ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ইরাকে আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

যুদ্ধ শুরুর সময় ওমরের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি বলেন, ‘আমরা বোমার শব্দ মনে করতে পারি। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম।’

বাগদাদে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর কী ঘটছে তা দেখতে তার কয়েকজন বন্ধু বাইরে গিয়েছিলেন। বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা বের হন।

ওমর বলেন, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, তোমরা কেন যাচ্ছ? এরপর তারা গেল, কিন্তু আর ফিরে আসেনি। আমরা যখন সেসব কথা মনে করি, খুব কষ্ট হয়।’

বিমান ও ড্রোন হামলার বিস্তার

স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএসআইএল) বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তানে ৪২৩টি মার্কিন হামলায় আনুমানিক দুই হাজার ৪৯৯ থেকে চার হাজার একজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২৪ থেকে ৯৬৬ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।

ইয়েমেনে অন্তত ১৮৬টি হামলা ও অভিযান চালানো হয়েছে, যাতে অন্তত ৮৫৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৫৮ জন বেসামরিক নাগরিক।

সোমালিয়ায় ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ১৯ থেকে ২৩টি হামলায় ১৮৮ থেকে ২৭৬ জন নিহত হন।

২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমনের সময় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের অনুমোদনে লিবিয়ায় বিমান অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, সাত মাসে দেশটিতে প্রায় নয় হাজার ৭০০টি হামলা চালানো হয়। পরে বিদ্রোহী যোদ্ধাদের হাতে গাদ্দাফি আটক ও নিহত হন।

২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসআইএলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’। এতে ব্যাপক বিমান ও স্থল অভিযান চালানো হয় এবং কয়েক হাজার বোমা নিক্ষেপ করা হয়।

২০১৮ সালের মধ্যে এসব হামলায় ব্যাপক ধ্বংস ও প্রাণহানি ঘটে। মার্কিন কর্মকর্তারা এক হাজার ৪১৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে সামরিক অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণকারী লন্ডনভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা এয়ারওয়ার্সের হিসাবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আট হাজার ২৬৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৬০ জন।

বাস্তুচ্যুত তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধের কারণে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, ফিলিপাইন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় তিন কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ নিজ দেশ বা দেশের বাইরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

দুই দশকের বেশি সময় পরও বহু মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হচ্ছে।

গত বছর ইরান ও পাকিস্তান প্রায় ২৯ লাখ আফগানকে সীমান্ত পেরিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করে। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের দুই দশক পরও ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন।

৪০ বছর বয়সী আফগান নারী আয়েশা জীবনের বড় একটি সময় আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে তার পরিবার প্রথমবার আফগানিস্তান ছেড়ে যায়। ২০০০ সালে ফিরে এলেও ২০০২ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর আবার দেশ ছাড়তে হয়।

ইরানে ১১ বছর থাকার পর তাকে ও তার সন্তানদের বহিষ্কার করা হয় এবং আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়।

আয়েশা বলেন, ‘আমি অনেকবার গিয়েছি, আবার ফিরে এসেছি। শেষবার আমরা সেখানে ১১ বছর ছিলাম। কিন্তু ইরানিরা আমাদের বের করে দেয় এবং আমার সন্তানদের স্কুল থেকেও বহিষ্কার করে।’

মার্কিন সেনাদের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

আফগানিস্তানে আট লাখের বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে সর্বশেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগে সেখানে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত এবং ২০ হাজার আহত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্র দেশগুলোর সেনাদের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ৫০০ জন নিহত এবং ২৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, ইরাক যুদ্ধে তিন হাজার ৪৮১ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩১ হাজারের বেশি আহত হন।

তবে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় আরও বিশাল। কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের হিসাবে, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন সেনাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবায় ২০৫০ সালের মধ্যে দুই দশমিক দুই ট্রিলিয়ন থেকে দুই দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এর বড় অংশ এখনো পরিশোধ করা হয়নি।

অনেক সাবেক সেনাসদস্য এখনো মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছেন।

কস্ট অব ওয়ার প্রকল্পের পরিচালক স্টেফানি স্যাভেল আল জাজিরাকে বলেন, ‘৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধে যত মার্কিন সেনা ও সাবেক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন, আত্মহত্যায় মারা গেছেন তার চার গুণ।’

তিনি বলেন, যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা অনেকের মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) ও গুরুতর মানসিক আঘাতের হার বেশি। তাদের অনেককে অতীতের তুলনায় আরও ঘন ঘন নতুন অভিযানে পাঠানো হয়েছে। ফলে যুদ্ধের মূল্য পুরো সমাজের বদলে জনসংখ্যার নির্দিষ্ট একটি অংশকেই বেশি বহন করতে হচ্ছে।

‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ মূল্য আট ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

দুই দশকের যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক পাঁচ দশমিক আট ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর পাশাপাশি আগামী কয়েক দশকে সাবেক সেনাদের সেবায় আরও দুই দশমিক দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাব রয়েছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধের মোট ব্যয় অন্তত আট ট্রিলিয়ন ডলার।

২০৩০ সালের মধ্যে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যত অর্থ ব্যয় হবে, প্রায় সমপরিমাণ অর্থ সুদ পরিশোধেই খরচ হবে। এই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত এখনকার ২৫ বছরের কম বয়সী মার্কিন নাগরিকদের বহন করতে হবে।

বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, বিদেশে আগ্রাসী যুদ্ধ চালানোর বিষয়ে মার্কিন জনগণের আগ্রহ কম। ইরানে চলমান যুদ্ধও দেশটির জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়।

স্যাভেলের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অনেকেই আংশিকভাবে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বন্ধ এবং শান্তির প্রতিশ্রুতির কারণে তাকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় আসার পর বাস্তব চিত্র তার বিপরীত হয়েছে বলে মনে করেন স্যাভেল।

তার ভাষায়, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে বিমান হামলা বেড়েছে, সামরিক অভিযানের নিয়ম শিথিল করা হয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা কমানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ইরানে এই যুদ্ধ শুরু করা, ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌযানে হামলা, সব মিলিয়ে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সহিংসতা বাড়ানো হচ্ছে।’

Related Articles

Latest Posts