একদিকে কিম জং উনের ইস্পাত-কঠিন শাসন। অপরদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশা ও একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছোবল। সব মিলিয়ে, উত্তর কোরিয়ার বাসিন্দাদের ‘গোমড়ামুখ’ দেখেই অভ্যস্ত বিশ্ববাসী। তবে দৃশ্যপট বদলাচ্ছে।
একসময় অভাব-অনটনের জন্য পরিচিত দেশটি এখন ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও অভিজাত শপিং মলের সুবিধা উপভোগ করছে। মানুষ যাতে ভোগ্যপণ্য ও সেবায় ব্যয় বাড়াতে পারে, তা নিশ্চিত করতে নানা সরকারি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
আজ শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে।
এতদিন পর্যন্ত অবসর, ছুটি কাটানো, পর্যটন কিংবা বিনোদনের জায়গা হিসেবে ১০০টি দেশের নাম উল্লেখ করলেও সে তালিকায় সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার নাম আসবে না। দেশটা এমন রসকসহীন, যে মানুষের হাতে অর্থ থাকলেও তা খরচ করার জায়গা ছিল না।
সেই উত্তর কোরিয়ায় এখন অপ্রত্যাশিতভাবে আমোদ-ফূর্তির নানা ব্যবস্থা চোখে পড়ছে।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন নিজেই বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এখন তিনি তার দেশের জনগণের জন্যও বিলাসবহুল জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন।
চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্যেও এর সত্যতা মিলেছে।
গত এক দশকে উত্তর কোরিয়ায় ম্যাসাজের সরঞ্জাম আমদানি বেড়েছে ৪০ গুণ। ট্রেডমিলের চালান বেড়েছে ৬০০ শতাংশের বেশি। পিয়ানো, এমনকি বাম্পার কারও বিপুল পরিমাণে আমদানি করছে পিয়ংইয়ং।
উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন অংশে বিলাসবহুল শপিং মল, সমুদ্রতটে রিসোর্ট ও স্কি করার অবকাশকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। রয়টার্সের বাণিজ্য পরিসংখ্যান ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
পাশাপাশি, সম্প্রতি দেশটি সফর করেছেন এমন পাঁচ ব্যক্তি ও দেশটি থেকে পালিয়ে আসা অপর দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও এসব ঘটনার সত্যতা পেয়েছে রয়টার্স।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিষয়টি শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সরকারি উদ্যোগে বিনোদনকেন্দ্র ও খুচরা দোকান চালু করে কিম জং উন দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছেন। এতে অনানুষ্ঠানিক বাজারগুলো বিপাকে পড়েছে।
এসব উদ্যোগকে কিমের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের উপায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্যোগ হিসেবেও এগুলোকে দেখা যেতে পারে।
কিমের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিতে বাধা দিতে বিলাসপণ্য, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের বাণিজ্যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে জাতিসংঘ।
তা সত্ত্বেও, দেশটিতে এখন বিলাসবহুল পণ্য কেনা ও সেবা গ্রহণের সুযোগ বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাইয়ে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
টানা তিন বছর ধরে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের ওপরে ছিল বলেও জানা গেছে।
এই পরিবর্তন বাইরের বিশ্বেরও নজর কেড়েছে।
মে মাসে পিয়ংইয়ং সফরের পর সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান মত দেন, শহরটি ‘অসাধারণ’ উন্নতি করেছে।
তার ভাষায়, এটি পূর্ব এশিয়ার ‘যেকোনো আধুনিক শহরের’ মতো হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবির সত্যতা যাচাই করেছে রয়টার্স। এই পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজধানীতে গত বছর বিলাসবহুল শপিং মল রাংনাং অ্যায়েগুক কুমগাং সার্ভিস কমপ্লেক্সের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেখানে উত্তর কোরীয়দের ক্যাপুচিনো কফি পান করতে ও গৃহস্থালির সরঞ্জাম কিনতে দেখা যায়।
দুই বছর আগে চালু হওয়া হোয়াসং তাইদংগাং বিয়ার রেস্তোরাঁটিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রশংসিত হচ্ছে।
এপ্রিলে কিম তার মেয়ে কিম জু এ-কে নিয়ে একটি নতুন পোষা প্রাণীর দোকান ঘুরে দেখেন। সেখানে বিড়ালছানা ও কুকুরছানার প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখান কিম-কন্যা।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় উত্তর কোরিয়ার নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা আবার শুরু করার প্রণোদনাও কমেছে। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিমের সঙ্গে আবার বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত অন্তত ১ হাজার ২০০ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। জানা গেছে, ২০২২ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পর্যটন, অবসর ও সাংস্কৃতিক জীবন নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।
এর মধ্যে বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র চালু বা সংস্কারের খবরও রয়েছে।
সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, সামরিক বাহিনী ও পরমাণু কর্মসূচির উন্নয়নের পাশাপাশি কিম জং উন এবার দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কাজেও যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন।
তার এই কৌশল কতদিন কার্যকর থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
