তিন মাস প্রবেশ বন্ধ থাকার পরও সুন্দরবনে কমেনি প্লাস্টিক দূষণ। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই বনের বিভিন্ন নদী, খাল ও সৈকতে জমেছে বিপুল পরিমাণ পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট, কর্কশিটসহ নানা ধরনের বর্জ্য।
জোয়ার-ভাটার স্রোতে উপকূলীয় নদী-খাল থেকে এসব বর্জ্য ভেসে এসে সুন্দরবনে জমা হচ্ছে। একইভাবে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া নৌযান থেকে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকও স্রোতের সঙ্গে বনের বিভিন্ন এলাকায় পোঁছাচ্ছে।
৬ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনের কটকা, কচিখালি, জামতলা, ডিমের চর ও আন্ধারমানিকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সৈকত থেকে বনের অভ্যন্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে নানা ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে বর্জ্যের স্তূপ। কসমেটিকসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, বিভিন্ন পণ্যের বোতল, কর্কশিট ও পানিতে ভাসমান ছোট ছোট প্লাস্টিকের ড্রামসহ নানা সামগ্রী কোথাও সারিবদ্ধ, কোথাও এলোমেলোভাবে পড়ে আছে।
গত মঙ্গলবার ডিমের চরে প্রায় চার কিলোমিটারজুড়ে সাগরের তীরঘেঁষা উঁচু জায়গাগুলোতে কয়েক টন প্লাস্টিকসামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কটকা ও কচিখালি থেকেও বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক অপসারণ করা হয়েছে। জামতলার প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পথ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলেও সি-বিচ এলাকায় প্রচুর বর্জ্য দেখা গেছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনের প্লাস্টিক দূষণের জন্য শুধু পর্যটকদের দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত উৎস আড়ালেই থেকে যাবে। উপকূলীয় জনপদে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী-খালে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা এবং সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান থেকে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা এ দূষণের অন্যতম উৎস।
তিন মাস বন্ধের পরও বর্জ্যের স্তূপ
বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুমে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে বন বিভাগ। এ সময়ে সব ধরনের নৌযান চলাচলও বন্ধ ছিল।
পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে ৭, ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের পাঁচটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায় ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস)। তিন দিনে সংগঠনটির সদস্যরা ১৫ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে খুলনায় এনে ডাম্পিং করেন।
এর আগে গত মে মাসেও এই পাঁচটি পর্যটনকেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে ১২ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। তখনও পর্যটন মৌসুম শুরু হয়নি।
টোয়াসের সদস্যরা বলছেন, এবার বর্জ্যের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নদীপথে সুন্দরবনে যাচ্ছে প্লাস্টিক
সুন্দরবনের সীমানা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া পশুর, শিবসা, কপোতাক্ষ, শেলা, বলেশ্বর, খোলপেটুয়া, মালঞ্চ, চুনকুড়িসহ বেশ কয়েকটি নদী এসব বর্জ্য বহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে।
উপকূলীয় বিভিন্ন বাজার, মৎস্য আড়ত, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বসতবাড়ির আশপাশের ব্যবহৃত প্লাস্টিক নদী-খালে গিয়ে পড়ছে। পরে জোয়ারের পানিতে এসব বর্জ্য আবার বনের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, বাগেরহাটের মোংলা, চাঁদপাই, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ ও রামপাল; খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও কৈখালীর বিভিন্ন বাজার ও বসতবাড়ির আশপাশ থেকে এ ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে।
উপকূলীয় বাসিন্দারা জানান, কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠান, খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দ্রুত সেবা দিতে গিয়ে এসব পণ্যের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ব্যবহারের পর অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্লাস্টিক খাল, জলাশয় বা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের মৎস্যজীবী সোলায়মান শেখ ৩৫ বছর ধরে সুন্দরবনে মাছ শিকার করেন। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, আগে চরের ওপর আগাছা বা ছোট গাছ গজানোর সুযোগ থাকতো। এখন প্লাস্টিকে ভর্তি হয়ে থাকায় আগের মতো গাছ জন্মায় না।
সোলায়মান শেখ বলেন, আমরা চেষ্টা করি নিজেরা প্লাস্টিক না ফেলতে। কিন্তু ঘাটে বা বোটে কোনো ডাস্টবিন নেই। পানির বোতল বা খাবারের প্যাকেট কোথায় রাখবো, সেটাই বুঝি না। অনেক জিনিস আমরা নৌকায় করে লোকালয়ে নিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলি।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য
প্লাস্টিক দূষণের কারণে সুন্দরবনের গাছপালা, জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, প্রধানত তিনটি উৎস থেকে প্লাস্টিক দূষণ হয়। এর একটি হলো—আপস্ট্রিম সোর্স, আরেকটি জেলে ও পর্যটক এবং অন্যটি অননুমোদিত চলাচল। আপস্ট্রিম নদীগুলো থেকে প্লাস্টিক তুলে ফেলতে পারলে এই দূষণ ৭০-৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
নজরুল ইসলাম বলেন, প্লাস্টিক দূষণের ফলে সামুদ্রিক প্রাণী, বনের বাস্তুতন্ত্র ও গাছপালার ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এতে গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং বীজের অঙ্কুরোদগমের হার কমে যায়। আমাদের গবেষণায় এসব প্রভাবই দেখা গেছে।
‘যেকোনোভাবে খাদ্য শৃঙ্খলে প্লাস্টিক প্রবেশ করলে তা ব্যাপক ক্ষতি করে। গণসচেতনতা ছাড়া প্লাস্টিকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়’, বলেন তিনি।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুন্দরবনের প্লাস্টিক দূষণের জন্য শুধু পর্যটকদের দায়ী করলে সমস্যার বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। উপকূলীয় এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, জেলে ও ব্যবসায়ীদেরও সচেতন করতে হবে।
টোয়াসের সহসভাপতি মাঝহারুল হক কচি ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরাও চাই সুন্দরবন নিরাপদ থাকুক। আমাদের ব্যবসাও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাই আমরা নিজেদের উদ্যোগে নদী পরিষ্কার অভিযান চালাই এবং পর্যটকদের সচেতন করার চেষ্টা করি। তবে সরকার ও বন বিভাগের অংশগ্রহণ ছাড়া ব্যাপক পরিবর্তন সম্ভব নয়।
‘শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণই নয়, জাহাজে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে পর্যটকদের কাউন্সেলিংও করা হচ্ছে’, বলেন তিনি।
মাঝহারুল হক বলেন, মৌসুমের শুরু ও শেষে দুই দফায় সংগঠনের সদস্যরা একত্র হয়ে প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে খুলনায় নিয়ে ডাম্পিং করেন। এবার বর্জ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়ে এ কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি ভ্রমণেই টোয়াসের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে জাহাজ থেকে বর্জ্য অপসারণ করবেন।
নদীর বর্জ্য ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক বহন করে নেওয়া কিংবা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বন প্রহরীরা নিয়মিত টহল ও তল্লাশি চালালেও নদীপথে ভেসে আসা বর্জ্য ঠেকানো কঠিন।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাসানুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক বহন করে নিয়ে যাওয়া কিংবা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমাদের বন প্রহরীরা নিয়মিত টহল দিয়ে পর্যটক ও জেলেদের তল্লাশি করে। এরপরও নদীপথে ভেসে আসা প্লাস্টিক সুন্দরবনের নদী-খালে পৌঁছে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এটা শুধু বন বিভাগ বা টোয়াসের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয়দের সম্মিলিতভাবে সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। বন বিভাগ বছরে কয়েকবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায় এবং স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক সভা করে। সবার আগে দরকার সচেতনতা।
