লোহিত সাগরের দিকে এগোচ্ছে হুতিরা, ঘরছাড়া ৫০ হাজার ইয়েমেনি

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের আকস্মিক এই অগ্রযাত্রায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

স্থানীয় ত্রাণকর্মীদের বরাতে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, অনেক গ্রাম পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে পড়েছে। আবার বহু পরিবার হুতি সম্মুখসারির কাছে আটকা পড়ে খাবারের সংকটে রয়েছে।

চলতি সপ্তাহে দ্রুতগতির অভিযানে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলঘেষে একের পর এক শহর দখল করেছে। এসব এলাকা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। কয়েকশ মানুষ নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান।

অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ইয়েমেনে আবার পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। আগের সেই যুদ্ধে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত এবং আরও বহু মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছিলেন।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) শুক্রবার জানিয়েছে, তাইজ ও হোদেইদাহ প্রদেশে প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পাহাড়ি সবুজ ঢাল পেরিয়ে এসব এলাকা শুষ্ক উপকূলীয় সমভূমিতে গিয়ে মিশেছে। অনেক পরিবারের জন্য এটি দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো বাড়িঘর ছাড়ার ঘটনা।

আইওএমের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক মুখপাত্র জো লোরি কায়রোতে বলেন, ‘ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে।’

তিনি জানান, অনেকে শহর ছেড়ে নিজেদের মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ রয়েছে।

লোরির ভাষ্য, জরুরি আশ্রয়, নগদ সহায়তা, খাবার, নিরাপদ পানি, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী, চিকিৎসা ও সুরক্ষা সেবা এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘নতুন করে সম্মুখসারির যুদ্ধ, বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন বেসামরিক মানুষ।’

‘যারা পালিয়ে আসছেন, তাদের অনেকেই গোলাবর্ষণ ও সম্মুখসারির অগ্রগতির কারণে হঠাৎ বাড়িঘর ছেড়ে খুব সামান্য মালপত্র নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন’, বলেন তিনি।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা বৈশ্বিক সংঘাতের শিকার হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। এতে দেশটির থেমে থেমে চলা সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

মোখা দখলে হুতিরা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের এই অগ্রযাত্রা ছিল আকস্মিক ও দ্রুতগতির। এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মোখা দখল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শহরটি বিশ্বব্যাপী কফি বাণিজ্যের স্থান হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। চকলেটের স্বাদের কফির নামও এই শহরের নাম থেকে এসেছে।

মোখা থেকে গভীর রাতে পালিয়ে যাওয়া ৪৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ এএফপিকে বলেন, শহরটির পরিস্থিতি ছিল ‘প্রলয়ঙ্কর’।

আরেক বাসিন্দা মুজাহিদ তাহামি দক্ষিণের সরকার-নিয়ন্ত্রিত শহর এডেনের দিকে রওনা হন। তিনি বলেন, পালানোর সময় কিছু পরিবার ‘সশস্ত্র দলগুলোর লুটপাটের’ শিকার হয়েছে।

অন্যরা জানান, তারা সময়মতো পালাতে পেরেছেন। কেউ মোটরসাইকেলে করে বের হয়েছেন। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা এতটা ভাগ্যবান ছিলেন না এবং আটকা পড়ে আছেন।

বাব আল-মান্দেবের দিকে নজর

ইয়েমেনের বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দেশটির প্রতি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতির সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মতে, এই নীতিতে কূটনীতি ও উন্নয়নকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

দ্য গার্ডিয়ান জানায়, এই শতকের বড় একটি সময়জুড়ে সুন্নি আল-কায়েদা যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের দিকে তেমন মনোযোগ দেয়নি। ২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চলতি সপ্তাহে উপকূলের দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখলের মাধ্যমে পশ্চিমাবিরোধী হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে সরাসরি উপস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। প্রায় ২০ মাইল প্রশস্ত এই জলপথ এশিয়া ও ইউরোপকে সংযুক্ত করা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি রুট।

বাব আল-মান্দেব নামটির মোটামুটি অর্থ ‘অশ্রুর দরজা’ বা ‘দুঃখের দরজা’। তীব্র স্রোত ও বাতাসের কারণে আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের মধ্যকার এই পথ দিয়ে চলাচল বহু শতাব্দী ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে আধুনিক পণ্যবাহী জাহাজের জন্য সেখানে চলাচলে কোনো শারীরিক সমস্যা নেই।

কিন্তু হুতিরা যদি এই প্রাকৃতিক সংকীর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যেতে হবে, ফলে হাজার হাজার অতিরিক্ত নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে।

ইয়েমেনের এই লড়াইয়ের প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম যেখানে প্রায় ৮০ ডলারের কাছাকাছি ছিল, সংঘাতের কারণে তা ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

Related Articles

Latest Posts