জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে জামায়াতে ইসলামী। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
জামায়াত ও এনসিপির পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
গতকাল রোববার রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, দফায় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জনজীবনে নতুন সংকট সৃষ্টি করবে এবং দুর্ভোগ আরও বাড়াবে।
পরওয়ার বলেন, মূল্যবৃদ্ধির আগে সরকারের উচিত ছিল বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া, ব্যয় সংকোচন, অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো।
একইসঙ্গে বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ম বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।
এদিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকারের নজিরবিহীন অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার খেসারত আবারও দেশের ১৮ কোটি মানুষকে দিতে হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ও সৃজনশীল বিকল্প খুঁজে বের না করে জনগণের ওপর অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নাহিদ প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকাকালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে, সেই অর্থ কোথায় গেল। তিনি জ্বালানি আমদানিতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে কমানোরও দাবি জানান।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের অন্যান্য ব্যয় পুনর্বিন্যাস করে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
নাহিদ বলেন, জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাখ্যান করছে এনসিপি। অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করে ব্যয় পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, জনগণ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি-গ্যাস সংকট ও শিল্প-কারখানার স্থবিরতায় দিশেহারা, তখন গভীর রাতে তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার নতুন অর্থনৈতিক আঘাত হেনেছে।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিত্যপণ্য, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে পড়বে।
বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করে জনদুর্ভোগ লাঘবের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
খেলাফত মজলিসের আমির আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমবে।
তারা অবিলম্বে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার দাবি জানান।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার পুরো দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে জ্বালানি খাতে অপচয়, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল কাইয়ুম সুবহানী ও মহাসচিব মূসা বিন ইযহার বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়বে। তারা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদারের দাবি জানান।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানও বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জনগণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মানুষ চাপে রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর নতুন অর্থনৈতিক আঘাত হেনেছে।
তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকের সেচ ও উৎপাদন ব্যয়, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
ইরান বলেন, অপচয়, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ না করে জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ চাপানো উচিত নয়। তিনি বর্ধিত দাম অবিলম্বে প্রত্যাহার বা পুনর্বিবেচনা, গণপরিবহনের ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বিক্ষোভ
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। এতে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।
বিকেল পৌনে ৫টায় মহাখালীতে বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর ইউনিট।
এছাড়া সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাংলামোটর এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সন্ধ্যা ৭টায় পল্টন মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে।
