মূল্যস্ফীতি যখন কেবল কমতে শুরু করেছে, ঠিক এমন সময়ে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিবহন, উৎপাদন ও বিপণন ব্যয় বাড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।
গণপরিবহন, কৃষি ও শিল্পে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার থাকায় প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোয় ভোক্তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
একই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্কেল বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অথচ বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের লাখো-কোটি কর্মীর আয় একইভাবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই। এ কারণে দাম বাড়ানোর সময় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানান অর্থনীতিবিদেরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নানা ধরনের চাপ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ানোর বহুমুখী প্রভাব রয়েছে। এটি কৃষি, পরিবহন এবং এরপর শিল্প ও কারখানাগুলোকে প্রভাবিত করে।’
তিনি বলেন, ‘২০ টাকা বড় ধরনের বৃদ্ধি। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে একটি বাস চালানোর খরচ কতটা বাড়বে এবং ভাড়ার ওপর এর প্রভাব কী পড়বে, তা ভেবে দেখুন।’
নাজনীনের মতে, সব ধরনের জ্বালানির দাম একই হারে বাড়ানোর পরিবর্তে সরকারের আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিমিত পদ্ধতি নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ‘যদি ভর্তুকির বোঝা কমানোর উদ্দেশ্যেও এটি করা হয়ে থাকে, তাহলে তা ধীরে ধীরে করা যেত। গত দুই মাসে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার কমেছে, কিন্তু জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রাখা উচিত ছিল। আর পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ সমন্বয় করা যেত।’
দরিদ্র পরিবার, গণপরিবহন ও শিল্পে ডিজেল ও কেরোসিনের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন বেতন স্কেল প্রসঙ্গে নাজনীন বলেন, আলাদাভাবে দেখলে বেতন স্কেল বাড়ানোর তেমন প্রভাব নাও পড়তে পারে, কিন্তু দুটি ঘটনা একই সময়ে ঘটায় মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়বে। জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. দীন ইসলাম বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবখানে উৎপাদন, বিপণন ও ঋণ ব্যয় বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ‘ঋণ ও বিপণনের ব্যয় বাড়লে এক ধাক্কায় পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাবে।’
সরকার জনগণের আস্থা কীভাবে ধরে রাখে, তার ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কতদিন স্থায়ী হবে তা নির্ভর করতে পারে বলে জানান দীন।
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতে বেতন সমন্বয় না হলে তাদের প্রকৃত আয় কমে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্ভবত বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাই এই নীতি নেওয়ার সময়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।’
দীন বলেন, ভর্তুকির মাধ্যমে জ্বালানির দাম কম রাখা এবং রাজস্বের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার মধ্যে সরকারকে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি জ্বালানির দাম বাড়ান, তাহলে এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদে দৃশ্যমান হতে পারে। আর ভর্তুকির মাধ্যমে দাম কম রাখলে এর প্রভাব পরে আসলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আগে থেকে কোনো পরামর্শ না করে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, ‘যৌক্তিকভাবেই বললে, আমরা এ বিষয়ে জানতামই না। তারা হঠাৎ করেই কোনো পরামর্শ ছাড়াই এটি করেছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার কেন এটি করেছে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়নি। তাই এর পরিবর্তে আর কী করা যেত, সেই প্রশ্নই ওঠে না।’
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তেলের দাম কেন বাড়াতে হবে? গতকাল কি বিশ্ববাজারে হঠাৎ জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে?’
ভোক্তাদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সরকার জ্বালানির ওপর কর ও বিভিন্ন ধরনের চার্জ কমাতে পারত বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ‘তারা তেল থেকে বিভিন্ন ধরনের ফি ও কর পায়। দামের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকলে পুরো অর্থনীতির ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তারা এসব চার্জ কমাতে পারত।’
তিনি আরও বলেন, রাজস্বের সংকট জ্বালানির দাম বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়ার একটি কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি খুবই সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এ কারণেই তারা সহজ পথ বেছে নিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন জনগণের জন্য পণ্যের দাম আরও বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের পদক্ষেপ দেখে মনে হচ্ছে, তারা খুব দ্রুত অজনপ্রিয় হয়ে উঠতে চাইছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান সতর্ক করে বলেন, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পুরো অর্থনীতির উৎপাদন ব্যয়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং নিম্নআয়ের ও দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানির দাম অর্থনীতির প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।’
বেসরকারি খাতের কর্মী ও দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের আয় একই হারে না বাড়ায় তারাই এর সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কৃষিকাজে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কৃষিপণ্যের দামের ওপরও চাপ তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে ইতোমধ্যে স্থবির হয়ে থাকা শ্রমবাজার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা স্থবির মূল্যস্ফীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বৈষম্য বৃদ্ধি এবং বেকারত্বের হার বেড়ে যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমবাজার বেশ কিছুদিন ধরেই স্থবির হয়ে আছে এবং শিল্পায়ন বাড়ার সম্ভাবনাও কম। ফলে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে সামনে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।’
