আশুলিয়ায় প্রিটি গ্রুপের কারখানার সামনে যে ট্রাকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে অবৈধ পদ্ধতিতে সিলিন্ডার পরিবহন ও রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে এমন সিলিন্ডারও পাওয়া গেছে, যেটির ব্যবহারের মেয়াদ তিন বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে।
গত রোববার সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রিটি গ্রুপের লোডিং ও আনলোডিং এলাকায় ট্রাকে থাকা সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান জানান, কাভার্ড ভ্যান বা লরিতে এভাবে গ্যাস সংরক্ষণ ও পরিবহন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি বলেন, ‘কাভার্ড ভ্যান বা লরিতে করে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের কোনো আইন বা বিধানে এর অনুমতি নেই।’
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম বলেন, কারখানায় পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় ট্রাকের মাধ্যমে এসব সিএনজি সিলিন্ডার আনা হচ্ছিল। নিহতদের বেশির ভাগই ট্রাকচালক। ঘটনা তদন্তে বিজিএমইএ একটি কমিটি গঠন করেছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার
গতকাল সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদক বিস্ফোরণস্থল থেকে বেশ দূরে একটি হোটেলের ওপর পড়া একটি গ্যাস সিলিন্ডার দেখতে পান। ওই সিলিন্ডারের গায়ে লেখা ছিল, ‘ডু নট ইউজ আফটার ২০২১’, অর্থাৎ তিন বছর আগেই এটির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল।
আশুলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন, ‘সিলিন্ডারটি ২০২১ সালের পর ব্যবহার করার কথা ছিল না, তারপরও সেটি ব্যবহৃত হচ্ছিল। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা অঞ্চলের জোন-৪ এর উপসহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের বিষয়টি আমরা এখনো পরীক্ষা করে দেখিনি। তবে প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, আগুনের সংস্পর্শ অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের কারণেই এই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’
ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত ব্যক্তিরা জানান, বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আশপাশের ভবনগুলো কেঁপে ওঠে। সিলিন্ডারের টুকরা ও লোহার পাত উড়ে গিয়ে আশপাশের দোকানপাট ও বহুতল ভবনে আঘাত হানে।
বিস্ফোরণে বাঁ পায়ের দুটি আঙুল হারানো ট্রাকচালক ওমর সুলতান (৩৮) জানান, লোডিং ও আনলোডিং এলাকায় সে সময় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী অন্তত ২৫টি ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি ঢাকার একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ওই সিলিন্ডারগুলো নিয়ে এসেছিলেন।
আব্দুর হালিম (৬০) জানান, একটি আস্ত সিলিন্ডার সাততলা একটি পোশাক কারখানা এবং পরপর তিনটি বহুতল আবাসিক ভবন টপকে তার হোটেলের ওপর এসে পড়ে। এতে তার ছেলে মিজানুর রহমান গুরুতর আহত হন। এর পরপরই আরেকটি সিলিন্ডার উড়ে এসে পাশের দোকানে বসে থাকা জয়নাব বেগম (৫৫) নামের এক নারীর ওপর পড়লে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। তবে জয়নাবকে আঘাত করা সিলিন্ডারটি পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিস্ফোরণস্থল থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে একটি দোতলা ভবনের দেয়াল ভেদ করে ধাতব টুকরা ঢুকে পড়ে। ওই সময় সেখানে থাকা গৃহবধূ নাজমা বলেন, ‘বিস্ফোরণের দুই মিনিট আগেই আমি ওই রুম থেকে বেরিয়ে পাশের ডাইনিং রুমে ফোন ধরতে গিয়েছিলাম। পুরো ভবনটি জোরে কেঁপে ওঠে। আমি ভয় পেয়ে মেয়েকে নিয়ে নিচে ছুটে যাই।’
নিহত ৭, ক্ষতিপূরণ
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম গতকাল জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৫ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাকি দুজনের মধ্যে একজন সবজি বিক্রেতা নজরুল এবং অপরজন জয়নাব বেগম। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে তাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ওসি আরও জানান, কারখানার ভবনগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি, কেবল পার্কিং এলাকায় থাকা গাড়িগুলো পুড়ে গেছে। আজ মঙ্গলবার থেকে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হবে।
আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (অপারেশনস) হারুন-অর-রশিদ জানান, তাদের হাসপাতালে আহত ২৫ জনকে আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গতকাল রাতে জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
