দেশে নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না। এতে দিন দিন শ্রমজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দৈনন্দিন খরচ আরও বেড়ে চলেছে।
সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৫৬ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে না মজুরি। এতে বাধ্য হয়ে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোর খরচ কমাচ্ছেন স্বল্প আয়ের মানুষরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ।
কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতের ৬৩ পেশার নিম্ন-আয়ের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মাসিক মজুরির হিসাব ধরে এই সূচক তৈরি করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগের (জিইডি) হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, আগস্টেও শ্রমজীবী পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এতটা কম ছিল যে তাদের চাপের মধ্য দিয়ে দিন পার হতে হয়েছে।
এই চাপ কমবে কি না, তা নির্ভর করবে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ওঠানামার ওপর। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। এটি বজায় থাকে কি না এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি উচ্চহারে থেকে যায় কি না, তার ওপর নির্ভর করবে শ্রমজীবী পরিবারগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি।
এর পেছনে শ্রমবাজারের গভীর সংকটগুলোকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। শ্রমবাজাতে অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিপত্য, দর কষাকষির দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের তুলনায় বেশি চাকরিপ্রার্থী এবং বিনিয়োগ স্থবির হওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, মজুরি ও মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ব্যবধান দেখলে বোঝা যায় দীর্ঘসময় ধরে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের অভাব রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। তাই মজুরি বাড়ছে না। উৎপাদনশীল কোনো খাতে কর্মসংস্থান দেখতে পাচ্ছি না।’
মজুরি বাড়ার বিষয়টি শুধু বাজার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
‘এটি শুধু চাহিদা ও জোগানের প্রশ্ন নয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক দর কষাকষির সক্ষমতার বিষয়। অতিরিক্ত শ্রমের জোগান এবং যৌথ দর কষাকষির ওপর রাষ্ট্রীয় কড়াকড়ির কারণে শ্রমিকদের পরিস্থিতি ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে,’ বলেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত মজুরি কমতে থাকার প্রবণতা মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘যারা এতদিন দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিলেন, তাদেরও নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’
মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই
শ্রমিকদের এই সংকটের সূত্রপাত মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার কারণে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা।
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে মূল সমস্যা হলো ন্যূনতম মজুরির জন্য কোনো আইন ও নিয়মিত মজুরি সমন্বয়ের কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই।’
‘অনানুষ্ঠানিক খাত তৈরি মানেই শ্রমিকদের দর কষাকষির সক্ষমতা নেই। ট্রেড ইউনিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হতে হবে এমন নয়, তবে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার জন্য কোনো না কোনো প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় না,’ বলেন তিনি।
অর্থনৈতিক মন্দা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যখন বাজারে শ্রমিকের চাহিদা কমে যায়, তখন তাদের দর কষাকষির ক্ষমতাও কমে যায়।’
বাজারে অতিরিক্ত শ্রমজীবীর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর নতুন চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন আগে থেকে আনুষ্ঠানিক কাজ না পাওয়া বেকার ও আংশিক বেকাররা।’
‘সবাইকে যদি আমরা হিসাব করি, তবে দেখা যাবে বাজারে চাহিদার তুলনায় শ্রমিকের জোগান অনেকটাই বেশি,’ তিনি বলেন।
‘একইসঙ্গে চাহিদাও কমছে। উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান না বাড়ায় শ্রমের চাহিদা দিন দিন কমে আসছে,’ যোগ করেন তিনি।
সরকারি তথ্য
অধ্যাপক বিদিশা সতর্ক করে বলেন, সরকারি পরিসংখ্যানে পুরো চিত্র উঠে নাও আসতে পারে।
তার মতে, পরিসংখ্যান ব্যুরোর মজুরি হার সূচক মূলত দৈনিক মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের হিসাব রাখে। এতে তাদের মজুরি কিছুটা বাড়তে দেখা গেলেও অন্যান্যদের অবস্থা হয়তো আরও খারাপ।
‘কিন্তু আমরা যদি পুরো শ্রমবাজার বিবেচনা করি, তবে দেখতে পাব অনেক জায়গাতেই প্রকৃত মজুরি কমছে। এমন কিছু শ্রমিক গোষ্ঠী থাকতে পারে যাদের মজুরি প্রকৃতপক্ষে কমছে, কিন্তু আমাদের হাতে থাকা তথ্য পুরো শ্রমবাজারকে তুলে না আনায় আমরা সঠিক মাত্রাটা বুঝতে পারছি না,’ বলেন তিনি।
এদিকে, অনানুষ্ঠানিক খাতে মজুরি স্থবিরতা সবচেয়ে প্রকট, যেখানে চাকরি পাল্টালেও শ্রমিকদের মজুরি খুব একটা বাড়ে না বলে জানান পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘মানুষ বদলায়, কিন্তু মজুরি একই থেকে যায়। ইটভাটা, পোল্ট্রি ফার্ম ও অন্যান্য শ্রমখাতে নিয়োগকর্তারা মজুরি না বাড়িয়েই সহজেই নতুন শ্রমিক নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।’
তিনি আরও জানান, কিছু দিনমজুরকে সাপ্তাহিক বা মাসিক নির্দিষ্ট চুক্তিতে কাজ করেন, যেখানে তাদের আয় দৈনিক মজুরির হিসাবে কম। কোনো শ্রমিক বেশি মজুরি দাবি করলে বা খারাপ আচরণের কারণে কাজ ছেড়ে দিলে, ওই কম মজুরিতেই অন্য কেউ সেই কাজ করতে রাজি হয়ে যায়।
পোশাকখাতের শ্রমিকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো থাকলেও কৃষি, পোল্ট্রি ও অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের এমন কোনো আইনি সুরক্ষা নেই বলে জানান তিনি।
পাশাপাশি, অনেক পুরুষ অটোরিকশা চালানোসহ অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় নারীরা ব্যাপকভাবে কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন, কিন্তু তাদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে তুলনামূলকভাবে কম।
‘আগে কৃষিতে যেখানে ৮০ শতাংশ পুরুষ কাজ করতেন, সেখানে এখন পুরুষের উপস্থিতি কমছে। নারীরা কৃষিকাজে বেশি যুক্ত হচ্ছেন, তবে তাদের মজুরি পুরুষদের চেয়ে কম,’ বলেন ওই কর্মকর্তা।
কৃষিকাজ ছেড়ে পুরুষ শ্রমিকেরা শিল্পে নাকি সেবা খাতে যাচ্ছেন—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় এ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
