৪ দশকের বেশি সময় ধরে ঢোলের ছন্দে মনের কথা প্রকাশ করে আসছেন রাজকুমার দাস। ময়মনসিংহের এই প্রবীণ বাদ্যশিল্পী নিজে বাজানোর পাশাপাশি তরুণদের ঢোল বাজানো শেখাচ্ছেন। তার লক্ষ্য, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যসংগীতের চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া।
ময়মনসিংহ শহরের বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাল তরঙ্গের স্বত্বাধিকারী সুভাষ চন্দ্র দাস বলেন, রাজকুমার এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অসংখ্য বাদ্যশিল্পীর কাছে একজন অভিভাবক। রাজশাহী, মাগুরা, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বিক্রমপুর, ঢাকা, নাটোর ও বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শিল্পীরা তার কাছে আসেন। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়।
ময়মনসিংহের বাদ্যশিল্পীদের মধ্যে পরিচিত নাম রাজকুমার। ৬০ বছর বয়সী এই শিল্পী ছোটবেলায় বাবা মোহন বাঁশি দাসের কাছে ঢোল বাজানো শেখেন। পরে প্রখ্যাত ঢোলবাদক ওস্তাদ হেলাল মুন্সির কাছে দুই বছর তালিম নেন। বাউলশিল্পী সুনীল কর্মকারও তার বাদ্যসংগীতের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করেন।
পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মাত্র ১৩ বছর বয়সে এই পেশায় যুক্ত হন রাজকুমার। এরপর পেশাদার ঢোলবাদক হিসেবে কেটে গেছে প্রায় ৪৭ বছর। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল ও লোকসংগীতশিল্পীদের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘদিনের সাধনায় ত্রিতাল, কাহারবা, দাদরা, তেওড়া, ঝাঁপতাল, খেমটা ও আদ্ধাসহ বিভিন্ন তাল ও ছন্দে দক্ষতা অর্জন করেছেন রাজকুমার। তার কাছে ঢোল বাজানো কেবল জীবিকা নির্বাহের উপায় নয়, বরং আজীবনের ভালোবাসা ও সাধনা।
সংগীতের টানে দেশের বাইরেও গেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে উদীচীর সদস্য হিসেবে কলকাতা সফর করেন রাজকুমার। ২০০১ সালে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যান নেপালে। দেশের কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলেও বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করেছেন। কাজ করেছেন বহু খ্যাতিমান বাউল ও লোকসংগীতশিল্পীর সঙ্গে।
তবে ঐতিহ্যবাহী সংগীতের প্রতি তার অবদান শুধু বাদ্যযন্ত্র বাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢোল শেখার আগ্রহ নিয়ে আসা প্রায় ১০০ তরুণকে বিনা পারিশ্রমিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। ঢোল তৈরিতেও রয়েছে তার দক্ষতা। অর্ডার পেলে নিজেই তৈরি করেন এই বাদ্যযন্ত্র।
দ্য ডেইলি স্টারকে রাজকুমার বলেন, ‘এই বাদ্যযন্ত্র বাজানো আমার কাছে অফুরন্ত আনন্দের উৎস। পূর্বপুরুষদের পেশাকেই আমি বেছে নিয়েছি। তবে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা সব সময় সহজ ছিল না।’
তিনি বলেন, ঢোলবাদকদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য। এই পেশা টিকিয়ে রাখতে তাদের আরও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। কাজের সুযোগও অনেকটা মৌসুমনির্ভর। দুর্গাপূজা ও কালীপূজার সময় কাজের চাহিদা বাড়লেও বর্ষাকালে তা কমে যায়।
রাজকুমারের ভাষ্য, অনেক ঢাক ও ঢোলবাদকের নিজেদের স্বার্থ তুলে ধরার মতো কোনো সংগঠন বা প্রতিনিধিত্বমূলক প্ল্যাটফর্ম নেই। ফলে তাদের অনেকে ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকেও বঞ্চিত হন।
তবলা শিল্পী অধীর দাস বলেন, রাজকুমারের পথচলা কেবল একজন সংগীতশিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। প্রাচীন সংগীতের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যশিল্পীদের যে সংগ্রাম করতে হয়, তার জীবন তারই প্রতিফলন।
ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম বলেন, উৎসবের কোলাহল ছাপিয়ে যখন ঢাকের গভীর ও গম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসে, তখন তার সঙ্গে বয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া এক ঐতিহ্য। রাজকুমারের মতো শিল্পীরা সারা জীবন সেই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার কাজ করে যাচ্ছেন।
