নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় বাড়িতে ঢুকে কৃষক মোমেন মিয়াকে (৬০) হত্যার ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, আসামিদের এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি অস্ত্র হাতে তাদের শোডাউনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে।
শহরের একটি হোটেলে গতকাল বুধবার পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তোলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন নিহতের ছোট ভাই আমিন মিয়া। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া অস্ত্র হাতে শোডাউনের একাধিক ভিডিও গতকাল বুধবার দ্য ডেইলি স্টারের নজরে আসে। প্রায় ৭ মিনিটের ভিডিওতে একদল লোককে ভেস্ট পরে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে সদাগরকান্দি এলাকায় মহড়া দিতে দেখা যায়।
তবে ভিডিওটি কবে ধারণ করা, সে ব্যাপারে দ্য ডেইলি স্টার নিশ্চিত হতে পারেনি।
গত ২ আগস্ট প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন মোমেন। সে সময় আরও পাঁচজন আহত হয়েছিলেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
উপজেলার চাঁনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোমেন সরকার এবং সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাশেমের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল।
এর জেরে ২ আগস্ট সকালে ২০-২৫ জন ইউপি চেয়ারম্যানের সমর্থক কৃষক মোমেন মিয়ার বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা গুলি ছুড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা আহত ছয়জনকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মোমেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
সেদিন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জান্নাতুল নাঈম জানিয়েছিলেন, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মোমেনের মৃত্যু হয়েছিল। তার মাথা ও পায়ে গুলির আঘাতের চিহ্ন ছিল।
অভিযোগ ওঠে, হামলার নেতৃত্ব দেন আবুল কাশেম ও ফরিদ উদ্দিন।
চাঁনপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোমেন সরকার ও মোমেন মিয়া সম্পর্কে চাচাতো ভাই।
বিরোধ প্রসঙ্গে মোমেন সরকারের অভিযোগ, ফরিদ উদ্দিনকে ছয় মাসের জন্য সাদাগরকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ ওঠায় তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
হত্যার অভিযোগ ওঠার পর যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ স্কাউটসের নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের সহকারী পরিচালক ফরিদ বলেছিলেন, ‘আমি এখন নোয়াখালীতে আমার কর্মস্থলে আছি। গ্রামের হত্যাকাণ্ডে আমি কীভাবে জড়িত থাকতে পারি!’
আবুল কাশেম এলাকাতেই অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একই দাবি করেছে মোমেন মিয়ার পরিবারের সদস্যরা।
তারা আরও অভিযোগ করেন, আসামিরা মামলা প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পরিবারের সদস্যরা বাড়িঘর ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে অন্যত্র অবস্থান করছেন।
হত্যাকাণ্ডের পরে মোমেনের ভাই আমিন মিয়া বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘মামলা করার পর থেকে আসামিদের ভয়ে আমাদের গ্রাম ছেড়ে থাকতে হচ্ছে। তারা বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে।’
এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজিবুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ দুই দফা অভিযান চালিয়েছে। কিছু অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।’
‘এলাকাটি দুর্গম। ফলে আসামিরা নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায়,’ যোগ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ব্যাপারে জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ভিডিওগুলো আমিরা বিশ্লেষণ করছি। অস্ত্র হাতে মহড়ার কিছু ভিডিও আমাদের কাছেও এসেছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
