রাজবাড়ীতে ৬৪ কোটি টাকার গড়াই সেতু: ৬ বছরেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ

বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে যেতে গড়াই নদী পার হতে হয় মো. আবদুল্লাহকে। এ জন্য প্রতিদিন নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় তাকে। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার নাদুরিয়া গ্রামের এই শিক্ষার্থী মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার লাঙ্গলবাঁধ উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে।

গড়াই নদীর ওপর ৬৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ছয় বছরেরও বেশি সময় আগে। আবদুল্লাহ ভেবেছিল, সেতুটি চালু হলে সহজেই বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারবে। কিন্তু তার স্কুলজীবন শেষের দিকে চলে এলেও সেতুর কাজ শেষ হয়নি।

আবদুল্লাহ বলে, ‘আমাদের গ্রামে একটা স্কুল ছিল। তারপরও পড়ালেখার মান ভালো হওয়ায় আমি লাঙ্গলবাঁধ উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আরেকটা কারণ ছিল, নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। ভেবেছিলাম, সেতুর কাজ শেষ হলে বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে মাত্র ১০ মিনিট লাগবে। আমার স্কুলজীবন প্রায় শেষ, কিন্তু সেতুর কাজ এখনো শেষ হয়নি।’

রাজবাড়ী স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, ‘ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন রুরাল রোডস’ প্রকল্পের আওতায় ৬৩ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭০ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। মীর হাবিবুল আলমের মালিকানাধীন এম এম বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং সেতুটি নির্মাণের কাজ পেয়েছে।

২০২০ সালের ৩ জুন সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ২০২৩ সালের ৩ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তিন দফা সময় বাড়ানো হয়। তৃতীয় দফায় সময় বাড়ানো হয়েছিল গত ১০ অক্টোবর পর্যন্ত, তবে এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সেতুর স্প্যান বসানো এবং সংযোগ সড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় নির্মাণকাজের গতি কমে যায়। সেতুটি চালু হলে রাজবাড়ী, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি পাংশা উপজেলার নাদুরিয়া ঘাটে নির্মাণ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সেতুটির চারটি স্প্যান ও দুটি গার্ডার বসানো বাকি। রাজবাড়ী প্রান্তে কাজ করছিলেন মাত্র তিনজন শ্রমিক। অন্যদিকে, মাগুরা ও ঝিনাইদহ প্রান্তে সংযোগ সড়কে বালু ভরাটের কাজ চলছিল।

নাদুরিয়া গ্রামের তানজিনা খাতুন বলেন, ‘এত বড় একটা সেতুর এই অংশে মাত্র তিনজন শ্রমিক কাজ করছেন। এত কম শ্রমিক নিয়ে এত বিশাল সেতুর নির্মাণকাজ কীভাবে শেষ হবে, ভেবে আমরা অবাক হচ্ছি। আগামী চার বছরেও সেতুর কাজ শেষ হবে কি না, সংশয় আছে।’

একই এলাকার কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কৃষিপণ্য বিক্রি করতে লাঙ্গলবাঁধ বাজারে যেতে হয়, কারণ এটাই আমাদের সবচেয়ে কাছের বাজার। নৌকায় নদী পার হতে গিয়ে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। এ কারণে সেতুটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

লাঙ্গলবাঁধ উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজবাড়ী জেলা থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী আমাদের বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। তবে নৌকায় নদী পার হতে হয় বলে তারা সবাই নিয়মিত ক্লাসে আসতে পারে না। সেতুটা হলে আমাদের বিদ্যালয়ে ১৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আসত। আমরা চাই, সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হোক।’ 

পাংশা উপজেলার ফুলতলা গ্রামের ব্যবসায়ী মো. সুমন বলেন, ‘সেতুটি চালু হলে রাজবাড়ী থেকে আশপাশের জেলাগুলোতে সহজে ও কম খরচে মালামাল পরিবহন করা যাবে।’

এদিকে, সেতুর নির্মাণকাজে শ্রমিকসংকটের কথা জানান এক শ্রমিক। এর নির্মাণকাজে নিয়োজিত পিকুল হোসেন বলেন, এক মাস আগেও রাজবাড়ী প্রান্তে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু অনিয়মিত মজুরি পরিশোধের কারণে তিনজন ছাড়া বাকিরা চলে গেছেন। গত চার মাস ধরে তারাও মজুরি পাননি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আবদুল হামিদ দাবি করেন, সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় লাগবে। সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এখানে কাজ করা শ্রমিকেরা অন্য একটি সাব-ঠিকাদারের অধীনে কাজ করে। তাদের বেতনও দেয় ওই সাব-ঠিকাদার। এ জন্য তাদের মজুরির বিষয়ে আমাদের জানা নেই।’

রাজবাড়ী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ হাসান বলেন, রাজবাড়ী জেলার নাদুরিয়া অংশে সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা থাকায় সেতুর নির্মাণকাজ কিছুটা ধীরগতিতে এগিয়েছে। ইতোমধ্যে বরাদ্দ করা অর্থসহ রাজবাড়ী অংশের জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ‘এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করে আমরা সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করতে পারব। আশা করছি, যত দ্রুত সম্ভব সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে পারব।’

 

 

Related Articles

Latest Posts