ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে স্ত্রীকে নৌকায় তুলে নেন স্বামী। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে নৌকাটি ঢোকে শিকলবাহা খালে। সেখানে একপর্যায়ে স্ত্রীর মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তার মুখ চেপে ধরেন স্বামী। এরপর রশি গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে হাত-পা বেঁধে বস্তায় ভরে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় খালে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮) হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআই আরও জানায়, নিজের প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে জান্নাতুলকে বিয়ে করেছিলেন তার স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজু। বিষয়টি জানার পর তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরেই জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুজন হলেন মুসলিম উদ্দিন ও শুক্কুর আহমেদ। এ ঘটনায় জান্নাতুলের স্বামী রাজা মিয়া পলাতক রয়েছেন।
পিবিআই জানিয়েছে, বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মুসলিম উদ্দিন।
আজ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাংগীর হোসেন বলেন, গত ২ আগস্ট শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে একটি বস্তাবন্দী নারীর লাশ পাওয়া যায়। ওই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে জান্নাতুলের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পিবিআই জানায়, জান্নাতুল চট্টগ্রামের ম্যাপ সুজ লিমিটেড নামের একটি জুতার কারখানায় কাজ করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে নগরের চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে তার আগের বিয়ের কথা জানতে পারেন জান্নাতুল। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার বলেন, জান্নাতুলেরও আগে বিয়ে হয়েছিল। রাজা মিয়ার প্রথম বিয়ের কথা জানার পর দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য তৈরি হয়। একপর্যায়ে জান্নাতুলকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন রাজা। এ জন্য পূর্বপরিচিত মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন তিনি।
তদন্তে উঠে এসেছে, পরে তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন। তাতে কাজ না হওয়ায় জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর ব্রিজঘাটা এলাকায় নিয়ে যান রাজা। সেখানে আগে থেকেই সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুক্কুর আহমেদ এবং আরও একজন।
এমকেএইচ জাহাংগীর হোসেন বলেন, ইঞ্জিনচালিত সাম্পানটি চালাচ্ছিলেন মুসলিম উদ্দিন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে। রাত ৮টার পর জান্নাতুলের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান রাজা।
একপর্যায়ে তার মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন তিনি। এরপর জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন রাজা। আরমান নামের এক ব্যক্তি নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। পরে রশি দিয়ে জান্নাতুলের গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাকে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, কর্ণফুলী থানার কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনে শিকলবাহা খালে জান্নাতুলের লাশ ফেলে দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নৌকা নিয়ে ব্রিজঘাটা এলাকায় ফিরে যান।
জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন। গত ৬ অক্টোবর মামলাটি পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
