রাশিয়ার পোয়াবারো, নতুন নিষেধাজ্ঞারও কিছু অংশ আটকে দিলেন ট্রাম্প

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে শাস্তি দিতে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া নতুন নিষেধাজ্ঞার বেশ কিছু অংশ আটকে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার রাতে এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প জানিয়েছেন, এসব নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ কার্যকর না করা যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থেই’।

গত সেপ্টেম্বরে নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বিলটিতে সই করেছিলেন ট্রাম্প। আইনটি আগামী রোববার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। এর আগে দেশে জ্বালানির দাম কমাতে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনার কথা জানান ট্রাম্প।

বিবিসি জানিয়েছে, ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় মার্কিন আইনপ্রণেতারা বিস্মিত হয়েছেন। একইসঙ্গে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনটির নামকরণ করা হয়েছে প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার এই সিনেটর গত ১১ জুলাই মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইউক্রেনের অন্যতম জোরালো সমর্থক ছিলেন তিনি।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনটির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার অর্থনীতি। এতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ট্রাম্পকে। এসব দেশের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য চীন ও ভারত।

এ ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দেশটির সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রয়েছে আইনে। বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়া যেসব তেলবাহী ট্যাংকার ব্যবহার করে, সেই ‘ছায়া নৌবহর’ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, উভয় দলের ২০ জন আইনপ্রণেতা ট্রাম্পকে একটি চিঠি দেন। এতে তারা নতুন আইনটি যথাযথভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানান।

নিষেধাজ্ঞা বিলে স্বাক্ষর করায় ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে আইনপ্রণেতারা এর ‘পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করার অনুরোধ করেন।

তারা বলেন, পুতিনকে শান্তি আলোচনায় গুরুত্ব দিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে এ আইন ‘নির্ণায়ক’ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য গ্রাহাম আইনের নিষেধাজ্ঞাগুলো পূর্ণমাত্রায় এবং কোনো বিলম্ব ছাড়াই কার্যকর করতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ কার্যকর না করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।

ভার্জিনিয়ার কংগ্রেস সদস্য ডন বেয়ার অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প মস্কোর কাছে নতি স্বীকার করছেন এবং ইউক্রেন ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পাশ থেকে সরে যাচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বেয়ার লেখেন, ‘পুতিনের ব্যাপারে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের সঙ্গে আবারও বিশ্বাসঘাতকতার মতো। একইসঙ্গে রাশিয়ার অবৈধ আগ্রাসনের শাস্তি নিশ্চিত করতে কংগ্রেস যে আইন করেছে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সেই উদ্দেশ্যেরও বিরোধী।’

গত ৯ অক্টোবর পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার বিষয়ে সমঝোতার ঘোষণা দেন ট্রাম্প।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির, বিশেষ করে ডিজেলের দাম ব্যাপক বেড়েছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন মার্কিন ভোটারদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে চাইছেন ট্রাম্প।

তবে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল আমদানির এ সমঝোতার সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়া আর্থিক সুবিধা পেতে পারে।

এদিকে আগামী নভেম্বরে পোল্যান্ডে একটি বড় সামরিক মহড়ায় অংশ নেবেন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির কয়েকশ সেনা। দেশ তিনটি ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় মিত্র।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় সামরিক প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতেই এ মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে।

বিবিসি জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার সমঝোতাকে পুতিনের জন্য উপহার হিসেবে বর্ণনা করেছেন জেলেনস্কি। তার মতে, এটি এমন এক যুদ্ধে বিনিয়োগের শামিল, যে যুদ্ধের অবসান হওয়া উচিত।

গত রোববার ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, এ যুদ্ধবিরতি ‘অবিলম্বে কার্যকর’ হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

ট্রাম্পের এ ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। তবে তিনি বলেন, রাশিয়া হামলা বন্ধ করলে ইউক্রেনও হামলা বন্ধ রাখবে।

অন্যদিকে মস্কো জানায়, এ ধরনের কোনো সমঝোতায় তারা সম্মত হয়নি। এরপরও রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকে। তিন দিন পর ইউক্রেনও আবার হামলা শুরু করে।

এতে ইউক্রেনের কঠোর সমালোচনা করেন ট্রাম্প। রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে কিয়েভের হামলাকে তিনি ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেন। জবাবে জেলেনস্কি বলেন, তিনি শুধু ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের জন্য এ নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মঙ্গলবার রাতে স্টারলিংকের ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার সময় রাশিয়া ইউক্রেনে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী হামলা চালায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউক্রেন সরকার বিবিসিকে জানায়, এসব হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।

শুক্রবার জেলেনস্কি স্টারলিংকের গতি কমে যাওয়ার ঘটনাকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অপ্রীতিকর বিস্ময়’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, নেটওয়ার্কটির গতি তখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন সতর্ক করে জানিয়েছিল, ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ না করলে দেশটির সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ রাখা হতে পারে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এ গোয়েন্দা সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Related Articles

Latest Posts