গারিঞ্চা: ১৯৬২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেই বাঁকানো পায়ের জাদু

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু রূপকথা আছে, যা বারবার শুনলেও পুরোনো হয় না। ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপ তেমনই এক মহাকাব্য। যে কাব্যের নায়ক এমন এক মানুষ, যাকে দেখে ফুটবলার মনে হওয়াটাই ছিল কঠিন। তার নাম মানুয়েল ফ্রান্সিসকো দস সান্তোস, ব্রাজিলের যে কিংবদন্তিকে ফুটবল বিশ্ব চেনে ‘গারিঞ্চা’ নামে।

চার বছর আগে ১৯৫৮ সালে সুইডেনের মাটিতে ব্রাজিল প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। সেই দলে ছিলেন পেলের মতো এক বিস্ময় বালক, ছিলেন দিদি, ভাভাদের মতো তারকা। ১৯৬২ সালেও ব্রাজিল চিলিতে পা রেখেছিল হট ফেভারিট হিসেবে। সবার চোখ তখন পেলের ওপর। বিশ্ববাসীর ধারণা ছিল, ১৯৫৮ সালের মতো এবারও পেলে নিজের জাদুতে মুগ্ধ করবেন সবাইকে।

কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়ার মুখোমুখি ব্রাজিল। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে একটি শট নিতে গিয়ে পেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। কুঁচকিতে মারাত্মক চোট। সে যুগে বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়ম ছিল না, তাই খোঁড়াতে খোঁড়াতে পেলেকে একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেই ম্যাচ শেষ করতে হলো। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলেও ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন যেন এক ধাক্কায় খাদের কিনারায় এসে দাঁড়াল।

পেলের চোট ব্রাজিল শিবিরে শোকের ছায়া নামিয়ে আনল। দলের সেরা তারকা, গোলমেশিন— সবকিছুই তো পেলে! তাকে ছাড়া এই ব্রাজিল কি শিরোপা ধরে রাখতে পারবে? পুরো ফুটবল বিশ্বই যখন ব্রাজিলের বিদায়ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছিল, তখন দৃশ্যপটে হাজির হলেন এক অপ্রত্যাশিত ত্রাণকর্তা।

তিনি গারিঞ্চা, ছোটবেলায় পোলিওতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে যার ডান পা বাম পায়ের চেয়ে ছোট ছিল। হাঁটু দুটো ছিল অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, তার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাই কঠিন হবে। অথচ সেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘আলেগ্রিয়া দো পোভো’ বা ‘জনগণের আনন্দ’।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে পেলের বদলে মাঠে নামলেন আমারিল্দো, কিন্তু খেলার নাটাই ছিল গারিঞ্চার হাতে। প্রথমার্ধে নিষ্প্রভ থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে তিনি জ্বলে উঠলেন। দুজন স্প্যানিশ ডিফেন্ডারকে ঘোল খাইয়ে এমন এক নিখুঁত ক্রস বাড়ালেন, যা থেকে আমারিল্দো গোল করে ব্রাজিলকে তুলে নিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। শুরু হলো গারিঞ্চার আসল ম্যাজিক।

কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। ইংলিশদের রক্ষণভাগ তখন বেশ গোছানো ও সুশৃঙ্খল। তারা ভেবেছিল, গারিঞ্চাকে কড়া পাহারায় বোতলবন্দী করে ফেলবে। কিন্তু সেদিন গারিঞ্চা ছিলেন এক বুনো উল্লাসের মেজাজে। ডান প্রান্তের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পুরো আক্রমণভাগেই ছড়ি ঘোরাতে লাগলেন। ইংলিশ ডিফেন্ডারদের তিনি রীতিমতো পুতুলে পরিণত করলেন।

সেদিন গারিঞ্চা যা করেছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। প্রথমে কর্নার থেকে এক দুর্ধর্ষ হেডে গোল করলেন, যা তিনি সচরাচর করতেন না। এরপর তার নেওয়া একটি বুলেট গতির ফ্রি-কিক ইংলিশ গোলরক্ষক রন স্প্রিংগেট আটকালেও ফিরতি বলে গোল করেন ভাভা। আর শেষটা হলো ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া গারিঞ্চার এক জাদুকরী বাঁকানো শটে। ৩-১ গোলের জয়ে ইংল্যান্ডকে একাই বিদায় করে দিলেন গারিঞ্চা।

সেমিফাইনালে ব্রাজিলের সামনে স্বাগতিক চিলি। গ্যালারিতে তখন চিলিয়ান দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার। কিন্তু গারিঞ্চার কাছে প্রতিপক্ষ কিংবা দর্শক— সবই যেন গৌণ। এই ম্যাচেও তিনি জোড়া গোল করলেন। একটি তীব্র বাঁ-পায়ের শটে, অন্যটি হেডে। সাথে ভাভার একটি গোলও বানিয়ে দিলেন।

তবে এই ম্যাচেই ঘটল এক নাটকীয় ঘটনা। চিলির ডিফেন্ডার রোহাস বারবার ফাউল করে গারিঞ্চাকে আটকাতে চাইছিলেন। একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে গারিঞ্চা রোহাসকে হাঁটু দিয়ে আঘাত করে বসেন। রেফারি সাথে সাথে তাকে লাল কার্ড দেখান। মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারি থেকে উড়ে আসা একটি পাথর গারিঞ্চার মাথায় আঘাত করে। রক্তমাখা মাথায় মাঠ ছাড়েন ব্রাজিলের এই জাদুকর।

লাল কার্ড দেখার অর্থ হলো ফাইনালে খেলতে না পারা। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান কর্মকর্তারা তখন মরিয়া হয়ে মাঠে নামলেন। ফিফার কাছে আবেদন জানানো হলো। সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিত। সৌভাগ্যক্রমে, রেফারি জানালেন তিনি সরাসরি ফাউলটি দেখেননি, লাইন্সম্যানের কথায় লাল কার্ড দিয়েছেন। ভোটে পার পেয়ে গেলেন গারিঞ্চা!

ফাইনালের মঞ্চ প্রস্তুত। প্রতিপক্ষ সেই চেকোস্লোভাকিয়া। কিন্তু ম্যাচের আগে আরেক বিপত্তি। গারিঞ্চার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর। বাধ্য হয়ে চিকিৎসকরা তাকে কড়া মাত্রার অ্যাসপিরিন দিলেন। জ্বরে পুড়তে থাকা শরীর নিয়েই ফাইনালে মাঠে নামলেন তিনি। গোল হয়তো করতে পারেননি, কিন্তু তার মাঠে থাকাটাই চেক ডিফেন্ডারদের বুকে কাঁপন ধরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।

জ্বরের ঘোরে থাকা গারিঞ্চাকে আটকাতেই ব্যস্ত ছিল চেকোস্লোভাকিয়ার পুরো রক্ষণভাগ। আর সেই সুযোগে জিতো, ভাভা আর আমারিল্দো গোল করে ব্রাজিলকে এনে দিলেন ৩-১ ব্যবধানের অবিস্মরণীয় জয়। পেলের অনুপস্থিতিতে একাই দলকে কাঁধে তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতালেন গারিঞ্চা।

নকআউট পর্বেই তিনি করেছিলেন মহামূল্যবান চারটি গোল। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ‘গোল্ডেন বুট’ ভাগাভাগি করার পাশাপাশি জিতেছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’। ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা যেমন একাই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন, তার ঠিক ২৪ বছর আগে গারিঞ্চা সেই একই কীর্তি গড়েছিলেন ব্রাজিলের হয়ে।

পরবর্তী জীবনে অ্যালকোহলের নেশায় জড়িয়ে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে গারিঞ্চার করুণ মৃত্যু হয়। কিন্তু ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তার নামে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে আছে। বাঁকা পায়ের সেই দেবদূত দেখিয়েছিলেন, ফুটবল শুধু শারীরিক শক্তির খেলা নয়, এটি এক নিখাদ শিল্প।

Related Articles

Latest Posts