যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (এএসসিও) বার্ষিক সম্মেলনে ক্যানসার চিকিৎসা নিয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে।
মঙ্গলবার শেষ হওয়া এই সম্মেলনে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের নতুন ওষুধ, ওজন কমানোর ওষুধের সম্ভাব্য প্রভাব, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্তকরণ নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ করা হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
সম্মেলনে উপস্থাপিত ৭ হাজারের বেশি গবেষণার মধ্যে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার নিয়ে একটি গবেষণা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যানসারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত এ রোগের চিকিৎসায় কয়েক দশকের মধ্যে এটিকে প্রথম বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান রেভল্যুশন মেডিসিনসের তৈরি ‘ডারাক্সনরাসিব’ নামের নতুন একটি ওষুধ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে এটি প্রচলিত কেমোথেরাপির চেয়ে বেশি কার্যকর।
গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের অর্ধেকের বেশি ১৩ মাসেরও বেশি সময় বেঁচে ছিলেন, যা কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
অনকোলজিস্ট মন্টি প্যাল বলেন, উন্নত পর্যায়ের অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসায় এটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষকেরা ওজেম্পিক ও ওয়েগোভির মতো জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্ট ওষুধের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করেছেন। মূলত ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য তৈরি এসব ওষুধ বর্তমানে ওজন কমাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত ডায়াবেটিস চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তুলনায় জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্ট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ফুসফুস, স্তন, কোলোরেক্টাল ও লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।
তবে গবেষণার প্রধান লেখক মার্ক অরল্যান্ড বলেন, এই ফল নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
আরেকটি গবেষণায় অ্যাক্সিলারি লিম্ফ নোড ডিসেকশন নামে পরিচিত একটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এক বা দুটি লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়া স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই অস্ত্রোপচার না করলেও রোগীদের জন্য তা নিরাপদ হতে পারে।
এএসসিওর ভাইস প্রেসিডেন্ট জুলি গ্রালো বলেন, সম্ভবত অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লিম্ফ নোড অপসারণ করা হচ্ছে, যার ফলে রোগীরা অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ছেন।
প্রোস্টেট ক্যানসার নিয়ে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় জিনগত মিউটেশন থাকা রোগীদের চিকিৎসায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
গবেষণায় এনজালুটামাইড ও টালাজোপারিব ওষুধ একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
ফলাফলে দেখা গেছে, জিনগত মিউটেশন থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে টালাজোপারিব যোগ করার ফলে টিউমারের অগ্রগতি বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৬৫ শতাংশ কমেছে।
গবেষণার সমন্বয়কারী অধ্যাপক করিম ফিজাজি এই ফলাফলকে ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ এবং ‘বড় অগ্রগতি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সম্মেলনে লিকুইড বায়োপসি বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্তকরণ নিয়েও কয়েকটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়েছে।
এর মধ্যে ‘গ্যালেরি’ নামের একটি রক্ত পরীক্ষা উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই ৫০ ধরনের ক্যানসার শনাক্ত করতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা গবেষণায় কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তবে ১২ ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়ার হার কমেছে, এমন প্রমাণ মেলেনি।
গবেষকেরা বলছেন, ক্যানসার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় এসব প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
