দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ একটি ‘কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ’ দেশ বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন।
দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে আঙ্কারা ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান তিনি।
আজ শুক্রবার রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।
হাকান ফিদান বর্তমানে ২ দিনের সরকারি সফরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার চার দেশীয় সফরের শেষ গন্তব্য বাংলাদেশ।
সফর উপলক্ষে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষায় সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, ‘মানবতার অভিন্ন ঐতিহ্য রক্ষার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ এই দলিল, যা আমাদের উভয় দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে আমি আশা করি।’
তিনি জানান, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান এবং সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। এছাড়া বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সংস্থায় সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা আমাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বকে আরও গভীর এবং একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর অনেক বেশি শক্তিশালী ও দূরদর্শী স্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও জানান, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বর্তমানের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করেছেন।
রোহিঙ্গা সংকট বিশ্ব এজেন্ডায় রাখতে নিবিড় প্রচেষ্টা
হাকান ফিদান বলেন, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে বাংলাদেশ এক বিশাল মানবিক দায়িত্ব বহন করছে।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘রোহিঙ্গা মুসলমানদের ট্র্যাজেডি দুর্ভাগ্যবশত এখনো চলছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বছরের পর বছর ধরে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সমগ্র মানবতার পক্ষে এক ‘ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ’ প্রদর্শন করেছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার একটি স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য তুরস্ক প্রতিবেশী দেশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। ‘আমরা এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এজেন্ডায় সচল রাখতে নিবিড় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি,’ বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের পর বিকেলে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সরাসরি দেখতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।
সেখানে হাকান ফিদান তার দেশের সংস্থা—তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা, তুরস্কের দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট, তুর্কি দিয়ানেত ফাউন্ডেশন এবং তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন এবং ক্যাম্পে পরিচালিত ‘সাহরা হাসপাতাল’ পরিদর্শন করেন।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি আমরা তাদের স্বদেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করা অব্যাহত রাখব।’
নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি
বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতগুলো বৈশ্বিক গতিশীলতাকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে উল্লেখ করে হাকান ফিদান চলমান সংঘাত ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের সর্বত্র পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে আমরা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় অগ্রগতিকে স্বাগত জানাই। আমরা আশা করি এই আলোচনা একটি সুনির্দিষ্ট ফলাফল দেবে এবং স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ সুগম করবে।’
এই প্রক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধপূর্ব স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সব বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব— এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তুরস্ক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। তারা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের সঙ্গেই নয়, বরং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গেও পরামর্শ চালিয়ে যাচ্ছে।
ফিদান বলেন, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করতে পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে তুরস্ক অত্যন্ত মূল্যায়ন করে এবং এতে সক্রিয় সমর্থন দিচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সব পক্ষকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না করার আহ্বান জানান।
তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নেতানিয়াহু সরকার দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান নস্যাৎ করতে পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা অব্যাহত রেখেছে এবং পশ্চিম তীরে একের পর এক বেআইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ করা এবং লেবাননে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও হামলার অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনা।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়ে হাকান ফিদান বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের প্রতি শ্রদ্ধার এক বিশাল নিদর্শন। বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’
