মাউন্ট এভারেস্টের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য জড়িয়ে আছে দুই ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরি ও অ্যান্ড্রু কোমিন আরভিনের সঙ্গে।
১৯২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বত মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে অভিযানে নেমেছিলেন এই দুই পর্বতারোহী। ওই বছরের জুনে তারা নিখোঁজ হন। এর প্রায় ৭৫ বছর পর ১৯৯৯ সালের ১ মে ম্যালোরির মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। আর আরভিনের মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে প্রায় ১০০ বছর পর ২০২৪ সালে তার বুট, মোজা ও পায়ের অংশসহ প্রথম নিশ্চিত নিদর্শনের সন্ধান মেলে।
এখনো যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, তা হলো—তারা কি ১৯২৪ সালেই এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন? অর্থাৎ, ১৯৫৩ সালে হিলারি-তেনজিংয়ের প্রথম নিশ্চিত জয়ের ২৯ বছর আগেই কি তারা শিখরে উঠেছিলেন, নাকি এর আগেই দুর্ঘটনায় তাদের অভিযান থেমে যায়?
প্রায় এক শতাব্দী ধরে ম্যালোরি-আরভিনের এই অভিযান গবেষক ও পর্বতপ্রেমীদের কাছে এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও অনুসন্ধানবিষয়ক সাময়িকী ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ এবং জার্মান সংবাদমাধ্যম ‘ডয়েচে ভেলে’র প্রতিবেদনে ম্যালোরি-আরভিনের এভারেস্ট অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯২৪ সালে একটি ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে এভারেস্টের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন জর্জ ম্যালোরি ও অ্যান্ড্রু আরভিন। ম্যালোরির বয়স তখন ৩৭ বছর। আর আরভিন ২২ বছর বয়সী তরুণ। তাদের লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করা।
সে সময় নেপালে বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাই তারা তিব্বতের দিক থেকে এভারেস্টে ওঠা শুরু করেন।
৬ জুন ম্যালোরি ও আরভিন কয়েকজন তিব্বতি সহযোগীকে নিয়ে প্রায় ২২ হাজার ৯৬৬ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ‘নর্থ কোল’ থেকে চূড়ার উদ্দেশে রওনা হন। পরদিন তারা আরও ৩ হাজার ৯৩৬ ফুট উচ্চতা পাড়ি দেন। তাদের শেষ ক্যাম্প ছিল এভারেস্টের ২৬ হাজার ৯০২ ফুট উচ্চতায়।
সেখান থেকে তিব্বতি সহযোগীরা নিচে ফিরে আসেন এবং ম্যালোরির দেওয়া একটি চিরকুট দলের আরেক সদস্য নোয়েল ওডেলের কাছে পৌঁছে দেন।
চিরকুটে ম্যালোরি লিখেছিলেন, ‘আকাশ পরিষ্কার থাকলে আমরা সম্ভবত আগামীকাল (৮ জুন) খুব ভোরে রওনা দেবো।’
এতে ম্যালোরি এ আভাসও দিয়েছিলেন যে, পরের দিন ওডেল ঠিক কোন জায়গায় ও কখন তাদের দেখতে পারেন।
৮ জুন যখন আকাশের মেঘ কিছুটা সরে যায়, তখন ওডেল দূরে দুটি চলন্ত বিন্দু দেখতে পান। ধারণা করা হয়, ওই বিন্দু দুটি ছিলেন ম্যালোরি ও আরভিন। এরপরই চিরতরে হারিয়ে যান এই দুই পর্বতারোহী।
ম্যালোরি ও আরভিনের কোনো খোঁজ না পেয়ে ওডেল শেষ হাই-ক্যাম্পে যান এবং সেখান থেকে কিছুটা উপরেও ওঠেন। কিন্তু ঝড়ের কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি।
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযাত্রী দলের নেতা এডওয়ার্ড নর্টন তখন লন্ডনের পত্রিকা ‘দ্য টাইমসে’ একটি টেলিগ্রাম পাঠান, যাতে লেখা ছিল ‘শেষ চেষ্টায় ম্যালোরি ও আরভিন নিহত হয়েছেন।’
এরপর ১৯৩৩ সালে আরেক ব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযাত্রী দল ২৭ হাজার ৭৫৫ ফুট উচ্চতায় আরভিনের বরফ কাটার কুড়াল (আইস অ্যাক্স) খুঁজে পায়।
১৯৬০ ও ১৯৭৫ সালে দুটি চীনা অভিযাত্রী দল এবং ১৯৯৫ সালে জাপানি অভিযাত্রী দলের কয়েক সদস্য এভারেস্টে আরোহণের সময় একটি পুরোনো মরদেহ দেখার দাবি করেন। তবে তাদের দেওয়া উচ্চতার তথ্য ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় তা নিশ্চিত করা যায়নি।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৬০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে অন্তত চারটি বর্ণনায় এভারেস্টে ‘একজন মৃত ব্রিটিশ পর্বতারোহীর’ মরদেহ দেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সবগুলো বর্ণনাতে স্পষ্টতার অভাব ছিল।
লেখক ও পর্বতারোহী মার্ক সিনট ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে বলেন, ‘আমার মনে হয় এ বর্ণনাগুলো বোঝানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ হলো “কনফ্লেশন” বা গুলিয়ে ফেলা বা জটলা পাকানো।’
তার মতে, এসব বর্ণনা দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ডয়েচে ভেলে ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ১ মে মার্কিন পর্বতারোহী কনরাড অ্যাঙ্কার এভারেস্টের উত্তর দিকে প্রায় ২৬ হাজার ৭৬৮ ফুট উচ্চতায় বরফে জমে থাকা ম্যালোরির মরদেহ খুঁজে পান। তার পা ভাঙা ছিল ও মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। তখনো আরভিনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
দুই প্রতিবেদনেই বলা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন পর্বতারোহী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জিমি চিনের নেতৃত্ব একটি দল এভারেস্টের উত্তর দিকে সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহ এলাকায় একটি বুট খুঁজে পান। বুটের ভেতরে একটি পা ও মোজা ছিল। মোজায় সেলাই করে লেখা ছিল—‘এ সি আরভিন’ (অ্যান্ড্রু কোমিন আরভিন)।
সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহ হলো দক্ষিণ তিব্বতে এভারেস্টের উত্তর ঢালে অবস্থিত একটি বিশাল হিমবাহ উপত্যকা।
ওই বছর ১১ অক্টোবর এ আবিষ্কারের খবর প্রকাশ্যে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া বুট, মোজা ও পায়ের অংশ প্রায় নিশ্চিতভাবেই ১০০ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া পর্বতারোহী আরভিনের।
তারা জানান, বুটটিতে ১৯২০ এর দশকে পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত লোহার পেরেক লাগানো ছিল। এ ছাড়া চামড়ার ক্ষয়প্রাপ্ত অবস্থাও প্রায় ১০০ বছর বরফের নিচে পড়ে থাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দুই প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়, নতুন আবিষ্কার থেকে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে—আরভিন এভারেস্টেই মারা গিয়েছিলেন।
আরভিনের আত্মীয় জুলি সামার্স (যিনি আরভিনের জীবনী লিখেছেন) ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে বলেন, ‘বুট, পা আর মোজা—এটিই তার শেষ পরিণতির গল্প বলে দেয়।’
তবে প্রশ্ন থেকে যায় আরভিনের বুট, পা আর মোজা কীভাবে সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহে এসে পৌঁছাল?
এ বিষয়ে জার্মান পর্বতবিষয়ক ইতিহাসবিদ জোচেন হেমলেবের ভাষ্যে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ডয়েচে ভেলে।
হেমলেবের মতে, আরভিন এভারেস্টের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে নিচে পড়ে যেতে পারেন বা কোনো তুষারধস তাকে ভাসিয়ে নিয়ে আসতে পারে কিংবা তার দেহ পাহাড় থেকে ছিটকে পড়তে পারে।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
হেমলেব বলেন, ‘নতুন আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি থেকে ম্যালোরি ও আরভিন সত্যিই এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন কি না কিংবা তাদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল—সে বিষয়ে তেমন কোনো নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত আমি এই রহস্যের কোনো সমাধান দেখতে পাচ্ছি না।’
ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যালোরি ও আরভিন তাদের অভিযানের ছবি তোলার জন্য একটি ছোট কোডাক ক্যামেরা সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জিমি চিন ও তার দল ঠিক কোথায় আরভিনের বুট খুঁজে পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করতে চান না। কারণ, এতে এভারেস্টের ওই অংশে আগ্রহীদের ভিড় বাড়তে পারে।
চিনের মতে, আরভিনের বুট উদ্ধারের মধ্য দিয়ে অনুসন্ধানের জন্য একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় এলাকা চিহ্নিত হয়েছে।
তার ধারণা, ওই এলাকার আশপাশে আরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এমনকি বহু প্রতীক্ষিত ক্যামেরাটিও থাকতে পারে।
চিন বলেন, ‘যদি ক্যামেরাটি পাওয়া যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। ক্যামেরাটি হয়তো ম্যালোরি ও আরভিনের শেষযাত্রা এবং তারা এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।’
