মাত্র দুই দিন আগেও ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে সোফায় পাশাপাশি বসে আলোচনা করতে দেখা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে। গত বুধবার বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয় তাদের দুজনের এমন ছবি।
ইতালির টেলিভিশন চ্যানেল ‘লা-সেভেন’ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছেন, মেলোনি নাকি তার সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য অনুনয়-বিনয় করেছিলেন।
এমনকি ট্রাম্প ইঙ্গিত করেন যে, তিনি কেবল মেলোনিকে একটু ‘প্রশ্রয়’ দিচ্ছিলেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি চাইলে এক বাক্যে ট্রাম্পের দাবি অস্বীকার করে বিষয়টি শেষ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন।
গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ভিডিওবার্তায় মেলোনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য সম্পূর্ণ বানোয়াট। আমি সত্যিই বিস্মিত। আমি জানি না, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কেন তার মিত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ করছেন—এটা প্রথম নয়।’
Io e l’Italia non imploriamo mai. pic.twitter.com/sTpKlqWB67
— Giorgia Meloni (@GiorgiaMeloni) June 19, 2026
তিনি আরও বলেন, ‘এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে যুক্তরাষ্ট্রের আসল শত্রুদের সামনে এমন দৃঢ়তা দেখাতে পারেন না ট্রাম্প। বরং ওইসব শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে তাকে অনেক বেশি সহনশীল ও নমনীয় দেখা যায়।’
ভিডিওবার্তার পাশাপাশি বাস্তবেও ইতালির প্রতিক্রিয়ার প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নির্ধারিত সফর ইতোমধ্যে বাতিল করেছেন ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি। মায়ামিতে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র–ইতালি ব্যবসায়িক সম্মেলনও বাতিল করা হয়েছে।
এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, মেলোনির প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে বিশ্বরাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। একসময় যারা ট্রাম্পকে এড়িয়ে চলতেন কিংবা সরাসরি সমালোচনা করতে ভয় পেতেন, তাদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
সিএনএন জানায়, একের পর এক উস্কানিমূলক আচরণ এবং ক্রমশ কমতে থাকা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনেক মিত্রদেশের কাছে অসন্তোষের পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন ট্রাম্প।
মেলোনির মতো একই পথ বেছে নিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।
চলতি সপ্তাহে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ট্রাম্পের সম্মানে ভার্সাই প্রাসাদে এক রাজকীয় নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন তিনি। কিন্তু একটি ব্যক্তিগত বিষয়ে ট্রাম্প আপত্তিকর মন্তব্য করলে কড়া জবাব দেন মাখোঁ।
একটি পুরোনো ভিডিওর সূত্র ধরে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন যে, মাখোঁ নাকি তার স্ত্রীর হাতের ‘থাপ্পড় খেয়ে এখনও সামলে উঠতে পারেননি।’
জবাবে মাখোঁ বলেন, ‘ট্রাম্পের এই মন্তব্য মার্জিত ছিল না এবং রাষ্ট্রপ্রধানসুলভ স্ট্যান্ডার্ডেও পড়ে না।’
শুধু ব্যক্তিগত বিষয়ই নয়, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানেরও সমালোচনা করেছেন মাখোঁ। তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘যুদ্ধ কোনো নাটক বা শো নয়।’ ট্রাম্পকে নিজের মন্তব্য নিয়ে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নীতি নিয়ে অধিকাংশ ইউরোপীয় নেতাই ক্ষুব্ধ। কারণ অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা কম-বেশি সবাইকে নিতে হয়েছে।
গত এপ্রিলে ইঙ্গিতে মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান ট্রাম্পকে স্রেফ নাচিয়ে ছাড়ছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে ‘বেপরোয়া ও অবৈধ’ বলে আখ্যা দেন।
তিনি বলেন, ‘শুধু কারো প্রতিশোধের ভয়ে আমরা এমন কোনো কিছুর সহযোগী হব না, যা বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর।’
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সানচেজ কটাক্ষ করে বলেন, ‘পৃথিবীতে আগুন লাগিয়ে এখন এক বালতি পানি নিয়ে এলে স্পেন সরকার তাতে হাততালি দেবে না।’
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিশ্বনেতাদের এই ক্ষোভের সূত্রপাত অবশ্য বছরের শুরুতেই হয়েছিল।
গত জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প যখন ন্যাটোভুক্ত দেশ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখল বা কিনে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন অনেক নেতাই এর প্রতিবাদ জানান।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অস্ত্র হিসেবে এবং শুল্ককে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে।’
এর কিছুদিন পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের নিন্দা জানান।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোর সেনারা নাকি ফ্রন্টলাইনে গিয়ে যুদ্ধ করা এড়িয়ে চলত।
স্টারমার একে ‘অপমানজনক এবং অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে ক্ষোভ জানান।
ওই যুদ্ধে ন্যাটোর এক হাজারের বেশি সেনা নিহত হয়েছিল। ঘটনা বেগতিক দেখে পরের দিনই ব্রিটিশ সেনাদের সাহসিকতার প্রশংসা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন ট্রাম্প।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অনেক বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে যেতে চাননি কেউ। অনেক নেতাই ভাবতেন—ঝামেলা না বাড়িয়ে তাল মিলিয়ে চলাই ভালো, যাতে পরিস্থিতি শান্ত থাকে।
কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ও ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় মিত্র দেশের নেতাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।
সবশেষ ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনির এই প্রকাশ্য ক্ষোভকে অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের প্রতি মিত্র দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
