ইউরোপে তাপদাহে পুড়ছে ১০ কোটির বেশি মানুষ, স্পেনে চার দিনে ২১২ জনের মৃত্যু

ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কোনো বিরতি নেই। আজ বৃহস্পতিবার অন্তত ১০ কোটি ১০ লাখ ইউরোপীয় নাগরিককে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি আফ্রিকার অনেক অঞ্চলের তুলনায়ও বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে।

জার্মান আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস ও ইউরোপীয় যৌথ গবেষণা কেন্দ্রের ২০২৫ সালের জনসংখ্যা তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ৩৮ কোটিরও বেশি মানুষ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা অনুভব করবেন।

ফ্রান্স ও স্পেনসহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে চরম গরমে প্রাণহানির হিসাব শুরু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়েছে। এমন আবহাওয়ার উপযোগী নয়—এমন অবকাঠামো ও নগর পরিকল্পনাও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেন, ‘ইউরোপের এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহে জলবায়ু সংকটের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণের মূল্যই এখন মানবজাতিকে দিতে হচ্ছে। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো বন্ধ না হলে চরম তাপমাত্রা আরও বাড়তেই থাকবে।’

ফ্রান্সে বৃহস্পতিবার দেশের প্রায় পুরো অংশেই তীব্র গরমের সতর্কতা জারি ছিল। ৬ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়েছে।

এ ছাড়া, জার্মানিতে ৭ কোটি, ইতালিতে ৪ কোটি ৮০ লাখ এবং যুক্তরাজ্যে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

যদিও শুক্রবার থেকে পশ্চিম ইউরোপে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে, পূর্ব ইউরোপে সপ্তাহান্ত পর্যন্ত তাপমাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কায় লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

স্পেনে চার দিনে ২১২ মৃত্যু

স্পেনে জুন মাসের নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকারি মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ‘মোমো’ জানিয়েছে, রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত ২১২ জনের মৃত্যু তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

গত বছর ১৬ মে থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্পেনে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৩২, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

চলতি সপ্তাহে স্পেনে জুন মাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার গড় তাপমাত্রা ছিল ২৮ দশমিক ০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর মঙ্গলবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ১৭ ডিগ্রিতে।

রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও ছিল রেকর্ড উচ্চতায়। সোমবার ২০ দশমিক ১৪ ডিগ্রি এবং মঙ্গলবার ১৯ দশমিক ৮১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এসব ‘উষ্ণ রাত’ মানুষের ঘুম ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফ্রান্সে গাড়িতে তিন বছরের শিশুর মরদেহ

ফ্রান্সের প্যারিস অঞ্চলে একটি গাড়ির ভেতর থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে তীব্র গরমে এ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হলো।

পুলিশ সূত্র জানায়, সাঁ-গ্রাতিয়েন শহরে নিজ বাড়ির সামনে পার্ক করা গাড়িতে শিশুটিকে মৃত অবস্থায় খুঁজে পান তার বাবা-মা।

ফ্রান্সে বুধবার ১৯৪৭ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে উষ্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেদিন জাতীয় গড় তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

প্যারিসে বুধবার তাপমাত্রা পৌঁছায় ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে, যা ১৫০ বছরে চতুর্থবারের মতো ৪০ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করল।

এর আগে সোমবার দক্ষিণ ফ্রান্সের কারপঁত্রা শহরে পারিবারিক গাড়ি থেকে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।

খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে মানুষ

প্যারিসে বুধবার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বহু মানুষ ঘরের ভেতরের গরম সহ্য করতে না পেরে পার্কে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। কেউ হ্যামকে, কেউ আবার ক্যাম্পিং ম্যাটে শুয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন।

২৬ বছর বয়সী মাইসাম দেকোস বলেন, ‘ফ্যান থাকা সত্ত্বেও আমার অ্যাপার্টমেন্টে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। এখানে অনেক মানুষ আছে, পরিবেশও ভালো। ঘরের ভেতরের চেয়ে বাইরে থাকাই ভালো।’

অন্যদিকে ব্রাসেলসে জনসাধারণের জন্য পর্যাপ্ত সুইমিং সুবিধা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, ১০ লাখের বেশি মানুষের শহরে গরম থেকে বাঁচার মতো কোনো উন্মুক্ত সুইমিং পুল, সৈকত বা জলাধার নেই।

বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি

তীব্র গরমে পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য।

পশ্চিম লন্ডনের একটি বৃদ্ধাশ্রমে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বাসিন্দাদের নিয়মিত পানি ও ফলের রস সরবরাহ করা হচ্ছে।

হেইসের কিংসলে কোর্ট কেয়ার হোমের ব্যবস্থাপক শাইনি মাথাপ্পান বলেন, ‘বয়স্কদের জন্য পানিশূন্যতা বড় ঝুঁকি। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত অনেকেই তৃষ্ণা লাগলেও তা প্রকাশ করতে পারেন না।’

যুক্তরাজ্যে বুধবার জুন মাসের নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে। লন্ডনের দক্ষিণে গ্যাটউইক বিমানবন্দরের কাছে তাপমাত্রা ওঠে ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, আর দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের গসপোর্টে অস্থায়ীভাবে ৩৬ দশমিক ১ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়।

৯৭ বছর বয়সী বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা লুসিন নাজিকিয়ান বলেন, ‘প্রকৃতি আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ, কারণ আমরা সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছি। বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলে এর মূল্য সবাইকে দিতে হবে।’

Related Articles

Latest Posts