‘আমার মা-বোনদের এনে দাও, ওদের ছাড়া আমি বাঁচব না’—একই কথা বারবার বলতে বলতে মূর্ছা যাচ্ছেন ১৯ বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাত।
আজ শুক্রবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মা ও তিন বোনের মরদেহ পরিবারের একমাত্র সদস্য সিফাতের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শাহিনুর বেগম (৩৮) ও তার তিন মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), ইকরা বেগম (১৭), সিপা আক্তারকে (৯) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এখন ওই পরিবারের একমাত্র সদস্য সিফাত।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে (৩০) আটক করে পিটুনি দেন স্থানীয়রা। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভাসমান ফল বিক্রেতা ছিলেন।
রায়পুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আব্দুল মান্নান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আজ দুপুরে একটি হত্যা মামলা করেছেন সিফাত।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাত বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সিফাতের বাবা মো. কামাল। এরপর চার সন্তানকে মানুষ করার পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন শাহিনুর। ধার-দেনা আর মানুষের সহযোগিতায় বড় মেয়ে সায়মাকে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করান।
পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে সাত হাজার টাকা বেতনে রায়পুর বাজারের একটি নির্মাণসামগ্রীর দোকানে চাকরি নেন সিফাত।
দোকানটির মালিক সাইফুল ইসলাম মুরাদ ডেইলি স্টারকে বলেন, সিফাত প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে দোকানে চলে আসত। গতকাল নাস্তা না করেই কাজে এসেছিল। পরে তার মা ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, সিফাত নাশতা খেয়েছে কি না।
তিনি বলেন, দোকানের মোবাইল ফোন থেকে সিফাতের সঙ্গে তার মায়ের কথা হয়। তিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন, সিফাত নাস্তা খেয়েছে কি না। সিফাত বলেছিল—খেয়েছি। এরপর আর কোনো কথা হয়নি। কে জানত, এটাই ছিল মা-ছেলের শেষ কথা।
‘দুপুরের দিকে বাসায় ফিরে সিফাত যা দেখেছে, তা কারও পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়। ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল তার মা ও দুই বোনের নিথর দেহ। আর গুরুতর আহত অবস্থায় বড় বোন সায়মাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে বিকেল ৫টার দিকে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে তার মৃত্যু হয়’, বলেন তিনি।
মুরাদ বলেন, সিফাত অত্যন্ত ভদ্র ও পরিশ্রমী ছেলে। তার সামান্য বেতন আর প্রতিবেশীদের সহযোগিতাতেই তাদের সংসার চলতো। কিন্তু একদিনেই সে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেল।
লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রশিদ ডেইলি স্টারকে বলেন,
নিহতদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে নিহত শাহিনুর আক্তারের বাবা ও তার ছেলে সিফাতের কাছে চারজনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পিটুনিতে নিহত অন্তরের মরদেহ এখনো হস্তান্তর হয়নি। তার এক স্বজনের আসার কথা রয়েছে।
আব্দুর রশিদ বলেন, অন্তর ওই ভবনের ওপরের তলায় একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। প্রায় সাত-আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে লক্ষ্মীপুর শহরে চলে যান। পূর্বপরিচয়ের সূত্রে ওই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও আসা-যাওয়া ছিল।
‘এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্ট কী কারণ ছিল, তা উদঘাটনে কাজ করছে’, বলেন তিনি।
