ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন (১৭) গত ২২ জুন বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ ছিল। শুক্রবার রাত ১২টার দিকে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরিবারের দাবি, আওয়ামী লীগের মিছিলে গিয়েছিল সুমন। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নৌকা থেকে নদীতে লাফ দিয়ে সে নিখোঁজ হয়।
গত ২১ জুন সুমন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আওয়ামী লীগের মিছিলের একটি ছবি পোস্ট করেন।
আজ রোববার সুমনের খালু মো. জুয়েল বাবু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সুমন কাঁচামালের আড়তে কাজ করতো। সে যে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতো, এটা আমরা জানতাম না। ২২ জুন সকাল ১১টার দিকে সুমন বাসা থেকে বের হয়। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিল।
‘পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি—ওইদিন নৌকা নিয়ে সুমন আশুলিয়ার রুস্তমপুর এলাকায় আওয়ামী লীগের মিছিলে অংশ নেয়। সেখান থেকে একই নৌকায় সবাই আশুলিয়া গরুরহাট সংলগ্ন নৌকা ঘাটে যায়। আশুলিয়ায় যাওয়ার পরপরই পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে’, বলেন তিনি।
জুয়েল বাবু বলেন, অন্যরা যে যেভাবে পেরেছে, কেউ নদী সাঁতরে, কেউ আবার ঝোপঝাড় পেরিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। তবে সুমন নদীতে লাফ দেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল। আমরা নদীতে তাকে খুঁজেও পাইনি। শুক্রবার পুলিশ জানায়, নদী থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে মরদেহের পকেটে থাকা মানিব্যাগের ডকুমেন্ট ও পাঁচটি মোবাইল ফোন দেখে আমরা সুমনকে শনাক্ত করি।
তিনি আরও বলেন, আমরা কারও সঙ্গে ঝামেলায় যেতে চাইনি। তাই পুলিশের কথা মতো একটা অপমৃত্যু মামলা করেছি। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলার এজাহারে বাদী সুমনের সৎ ভাই মো. সালাউদ্দিন উল্লেখ করেন, গত ২২ জুন সুমন বন্ধু ও প্রতিবেশীসহ প্রায় ২০-২২ জনের সঙ্গে তুরাগ নদীতে নৌভ্রমণে যান। ধউর ব্রিজ ঘাট থেকে নৌকায় ওঠার পর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আশুলিয়া গরুর হাট ঘাটে তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে অসাবধানতাবশত সুমনসহ পাঁচ থেকে ছয়জন নদীতে পড়ে যায়। সাঁতার না জানার কারণে সেসময় সুমন নদীর স্রোতে ডুবে যায়।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাউদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। মামলা করার সময় আমার খালু জুয়েল বাবু সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলতে পারবেন।
এদিকে, গত ২২ জুন আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদুল জামান বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় ৪৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।
মামলার অধিকাংশ আসামি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের তুরাগ থানার বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতাকর্মী।
মামলার এজাহারে এসআই রাশেদুল উল্লেখ করেন, গত ২২ জুন দুপুরে জানতে পারি, আশুলিয়া গরুর হাটের পাশে একটি ট্রলারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৬০ থেকে ৬৫ জন নেতাকর্মী জড়ো হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন। বিষয়টি থানার ওসিকে জানালে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে তিনি পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অধিকাংশ ব্যক্তি পালিয়ে যান। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে আটক করা হয়।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ডেইলি স্টারকে বলেন, ২২ জুন দুপুরে ৩০ থেকে ৩৫ জনকে বহনকারী একটি নৌকা ঘাটে ভিড়ে। এ সময় পুলিশের পোশাক পরা ৮ থেকে ৯ জন এবং সাদা পোশাকের আরও ৮ থেকে ৯ জন তাদের ধাওয়া করেন।
পুলিশকে দেখে নৌকায় থাকা কেউ নদীতে লাফ দিয়ে সাঁতরে পালানোর চেষ্টা করেন, আবার কেউ শুকনো জায়গা ধরে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। পুলিশ নৌকায় উঠে চারজনকে আটক করে। পরে ঝোপঝাড়ে ধাওয়া করে আরও তিনজনকে আটক করা হয়। সেসময় নৌকার মালিকও পালিয়ে যান। পরে একই নৌকা করে পুলিশ নদীতে লাফ দেওয়া ব্যক্তিদের আটক করতে যায়। কিছুক্ষণ পর কাউকে না পেয়ে ফিরে আসে।
জানতে চাইলে এসআই রাশেদুল ডেইলি স্টারকে বলেন, ২২ জুন গরুর হাটের পাশে নৌকা ঘাটে মিছিল থেকে আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মীকে আটক করা হয়৷ অন্যান্যরা পালিয়ে যান।
নৌকা থেকে আটক ও কয়েকজনের নদী সাঁতরে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এজাহারে না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কাউকে নৌকায় পাইনি। ঘাটে আটক অবস্থায় পেয়েছি। তাদের পুলিশের অন্য একটি দল আটক করেছে। নৌকার বিষয়টি আমি জানি না।
গত ২২ জুনের পর তুরাগ নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে সুমনসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
আশুলিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) মাহবুবুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাতে তুরাগ নদের আশুলিয়া গরুর হাট-সংলগ্ন নৌকা ঘাট থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভাটিতে ভাসমান অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আমিনবাজার নৌথানার ওসি মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, ২২ জুনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনটি মরদের উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জুন সকালে দারুসসালাম থানাধীন তুরাগ নদ থেকে রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ২২ জুন থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
তিনি বলেন, ওইদিন দুপুরে দিয়াবাড়ি ঘাটে কয়েকজনের সঙ্গে গোসলে নেমে রনি মোল্ল্যা নামের একজন ডুবে যান। পরে ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর তাকে মৃত অবস্থায় পাড়ে তোলো হয়। রনির মৃত্যু হওয়ার ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
‘এছাড়া গতকাল ১৫ বছর বয়সী মারুফ হাসানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে গতকালই নিখোঁজ হয়েছিল’, বলেন ওসি হাসানুজ্জামান।
মারুফ হাসান ও রনি মোল্যার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে মৃত আরিফ হাসান রাকিবের চাচা আসাদুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। সে আওয়ামী লীগের মিছিল করতো শুনেছি। যা ঘটেছে ফেসবুকেই দেখেছেন। আমরা একটু ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।
সাতজনকে গ্রেপ্তারের মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল ডেইলি স্টারকে বলেন, গ্রেপ্তার সাতজনকে ২৩ জুন রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে হাজির করে পুলিশ। রিমান্ড আবেদনের শুনানি আজ অনুষ্ঠিত হয়। আদালত রিমান্ড আবেদন নাকচ করে সাতজনকে জেলগেটে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
আসামিদের বরাতে তিনি বলেন, তারা প্রথমে নৌকা নিয়ে তুরাগ এলাকায় একটি মিছিল করেন। পরে পিকনিকের উদ্দেশ্যে নৌকায় করে আশুলিয়া বাজার এলাকায় যান। সেখানে পৌঁছানোর পর পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা তাদের ধাওয়া করে মারধর করেন। এ সময় সাতজনকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে ও প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই নদীতে লাফ দেন।
