টানা সাত দিনের অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবান জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৩৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৯টি ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ জনপদ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এতে অন্তত ১২ হাজার ৫০০ পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতির এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
আজ মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে এসব তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সানিউল ফেরদৌস।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় (মাত্র ২ মিলিমিটার) সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
বন্যার চরম সময়ে নদী দুটির পানি বিপৎসীমার সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও মঙ্গলবার সকাল ৯টায় তা বিপৎসীমার বেশ নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
চলতি বন্যায় পাহাড়ধসে পাঁচজন এবং পানিতে ডুবে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৪৭টি স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ধস ও গাছ উপড়ে পড়ায় ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় সড়কগুলো পুনরায় চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৬১ কিলোমিটার এবং এলজিইডি ও স্থানীয় সরকারের আওতাধীন আরও ৯০ কিলোমিটার সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া চারটি ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে তিনটির সংস্কারকাজ এখনো চলমান।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্যমতে, বন্যায় জেলার ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে অন্তত ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বান্দরবানের ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৫৮২ জন অবস্থান করছেন।
ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে জেলা প্রশাসক জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে সাতটি উপজেলায় এসব বরাদ্দ বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়া বান্দরবান পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিদিন দুই বেলা করে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ দুর্গত মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) একযোগে কাজ করছে।
বন্যার সময় থানচিতে ১৬৭ জন ও রুমায় ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েছিলেন। সর্বশেষ আমিয়াখুমে আটকে পড়া চারজন পর্যটককে বিজিবির সহায়তায় নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে প্রশাসন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং প্রতিটি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ সহায়তা হিসেবে ৩ হাজার টাকা করে নগদ বরাদ্দের আবেদন পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ের পাদদেশে বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বান্দরবান পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে মাকসি খাল পুনঃসংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
