মাঠে ও মাঠের বাইরে—একের পর এক বিতর্ক, আলোচনা ও সন্দেহের জন্ম দিয়ে চলেছে এ বছরের ফিফা বিশ্বকাপ। সাধারণত কোনো বড় ম্যাচে দল হারলে রেফারি বা আয়োজকদের দিকে আঙুল তোলা নতুন কিছু নয়।
তবে এবারের নকআউট পর্বে এই ক্ষোভ আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বের তীব্রতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ফিফার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়া মূলত এসব বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের ক্রীড়া বিভাগ দ্য অ্যাথলেটিক বিশ্বকাপের এমন কয়েকটি হাই-প্রোফাইল বিতর্ক বিশ্লেষণ করেছে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড পেলেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে ফিফা।
অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সরকারি কর্মকর্তা ও ইউএস সকার ফেডারেশন ফিফার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিয়েছে।
বেলজিয়াম এর প্রতিবাদ জানালেও ফিফা তা নাকচ করে দেয়।
ট্রাম্প পরবর্তীতে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্ট দেন এবং গণমাধ্যমকে জানান যে তিনি নিজেই ইনফান্তিনোকে ফোন করেছিলেন।
গত বছরের ১৩ নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ডিফেন্ডার দারা ও’শেয়াকে কনুই দিয়ে মারার অপরাধে লাল কার্ড পেয়েছিলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।
১৮ নভেম্বর ওয়াশিংটনে এক জমকালো নৈশভোজে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে দেখা যায় পর্তুগালের এ তারকা খেলোয়াড়কে।
এর এক সপ্তাহ পরই রহস্যজনকভাবে লাল কার্ড পাওয়া রোনালদোর ওপর থেকে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ফিফা। ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি এক বছরের জন্য তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রেখে বিশ্বকাপে খেলার ছাড়পত্র দেয়।
অনেকে মনে করছেন, রোনালদোর মতো মেগাস্টারকে বিশ্বকাপের শুরু থেকে রাখতেই ফিফা এই বিশেষ ছাড় দিয়েছে। কারণ টিকিট বিক্রির দিক থেকে মেক্সিকো ও ব্রাজিলের পরেই সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল রোনালদোর পর্তুগালের ম্যাচের।
গতবছর ৫ নভেম্বর হঠাৎ করে ‘ফিফা পিস প্রাইজ-ফুটবল ইউনাইটস দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি নতুন পুরস্কার চালুর ঘোষণা দেয় ফিফা।
অভিযোগ রয়েছে, ফিফা কাউন্সিলের ৩৭ জন সদস্যের কাউকে না জানিয়েই প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনো একক সিদ্ধান্তে এই পুরস্কারের ঘোষণা দেন।
এই পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়ার দিন ফ্লোরিডার মায়ামিতে একটি বিজনেস ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্টও।
পরবর্তীতে ৫ ডিসেম্বর বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানের দিন ট্রাম্পের হাতেই এই প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেওয়া হয়।
এবারই প্রথম ফিফা টেনিসের মতো একটি বিশেষ সিডিং সিস্টেম বা ড্র বিন্যাস চালু করেছে। যাতে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দুই দল ফাইনালের আগে কোনোভাবেই মুখোমুখি না হতে পারে।
দ্য অ্যাথলেটিক জানায়, এটি মূলত বড় ম্যাচগুলো শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রেখে স্পন্সর, টিকিট ও ব্রডকাস্টারদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার একটি পরিকল্পিত চাল।
এবারই প্রথম খেলোয়াড়দের পানিশূন্যতা রোধে প্রতি অর্ধে বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক চালু করে ফিফা।
এতে নিজেদের কোনো আর্থিক লাভ নেই—ফিফা এমন দাবি করলেও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামগুলোতে টিভি ব্রডকাস্টাররা বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য বাড়তি সময় পান। যা ফিফার স্পন্সরদের বিশাল বাণিজ্যিক সুবিধা দিচ্ছে।
ব্লুমবার্গ ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়, হাইড্রেশন স্পটে শুধু বিজ্ঞাপন বিক্রি করেই ২৫ কোটি ডলার আয় করছে ফিফার স্পন্সররা।
কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ২-১ গোলে জয়ের পেছনে সম্প্রচারকারী ক্যামেরার তারের একটি পরোক্ষ ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
ম্যাচের একটি পর্যায়ে নরওয়ের গোলরক্ষক ওরিয়ান নিলান্ডের নেওয়া গোল কিকটি শূন্যে স্কাইক্যাম বা ঝুলন্ত ক্যামেরার তারে লেগে দিক পরিবর্তন করে নিচে পড়ে যায় বলে দাবি ওঠে।
যেখান থেকে জুড বেলিংহ্যাম গোল করে ম্যাচে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। নরওয়ের খেলোয়াড় ও কোচ এর প্রতিবাদ জানালেও রেফারি দাবি করেন, বলের ভেতরে থাকা বিশেষ চিপ প্রযুক্তিতে কোনো আঘাতের সংকেত মেলেনি।
তবে ভিডিও ফুটেজে বলটির অস্বাভাবিক গতিপথ এবং হঠাৎ নিচে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি প্রায় স্পষ্ট ছিল।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার খেলা ড্র হলেই দুই দল পরবর্তী রাউন্ডে যাবে এবং ইরান টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেবে—এমন সমীকরণ ছিল।
এ বিষয়ে ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের কুখ্যাত ‘ডিসগ্রেস অব গিহনে’র স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে ইরান দল আগেই ফিফাকে সতর্ক করেছিল।
তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে শেষ মুহূর্তে অস্ট্রিয়া ৩-৩ গোলে সমতায় ফেরার পর দুই দলই ম্যাচ ড্র করার জন্য অলসভাবে বল পাস করতে শুরু করে এবং কোনো দলই আর আক্রমণ করেনি।
ম্যাচটি ৩-৩ ড্র হওয়ায় ইরান বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায়।
অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক পাতানো খেলার অভিযোগ অস্বীকার করলেও ম্যাচ শেষের চিত্রটি চরম বিতর্ক তৈরি করেছে।
এবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও আর্জেন্টিনা নিয়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আজেন্টিনার তারকা ফুটবলার মেসি ও ইনফান্তিনোকে নিয়ে তৈরি অসংখ্য এআই ভিডিও।
ফুটবলপ্রেমীদের একটি অংশের দাবি—আর্জেন্টিনাকে জেতাতেই ফিফা পুরো টুর্নামেন্টে কলকাঠি নাড়ছে। কোনো অকাট্য প্রমাণ না থাকলেও, রেফারিদের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এই সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে।
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায় আলজেরিয়ান ফুটবল ফেডারেশন। ম্যাচের ৩০তম মিনিটে যখন আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে এগিয়ে, তখন মেসি আলজেরিয়ার অধিনায়ক ঈসা মান্দির পায়ে বুট দিয়ে আঘাত করেন। কিন্তু মেসিকে কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি, উল্টো তার হ্যাটট্রিকে ৩-০ ব্যবধানে ম্যাচটি জেতে আর্জেন্টিনা।
নকআউট পর্বে শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব যেন বিস্ফোরিত হয়।
৩-২ গোলের নাটকীয় ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো মিশর দল। দলের তারকা ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকো সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, ‘এই বিশ্বকাপ ট্রফিটি আগে থেকেই আর্জেন্টিনার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।’
মিশরের কোচ হোসাম হাসান হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘হয়তো তারা চেয়েছে লিওনেল মেসি যেন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকেন।’
দ্য অ্যাথলেটিকের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক প্রিমিয়ার লিগ অফিসিয়াল গ্রাহাম স্কট জানান, মিসরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
তবে ফিফার রেফারি প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা এই অভিযোগের কড়া জবাব দিয়ে বলেছেন, ম্যাচ অফিসিয়ালদের সততা নিয়ে ভিত্তিহীন প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা যখন সেমিফাইনালে ওঠে, তখনও ভিএআর বিতর্ক পিছু ছাড়েনি।
ম্যাচের একপর্যায়ে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে ডাইভিংয়ের (অভিনয় করার) অপরাধে ভিএআরের ‘ভুল খেলোয়াড় চিহ্নিতকরণ’ নিয়মের সুযোগ নিয়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড অর্থাৎ লাল কার্ড দেখানো হয়।
সুইস খেলোয়াড়দের দাবি—পেনাল্টি বক্সের বাইরে সাধারণ একটি ঘটনার জন্য লাল কার্ড ইস্যুর সিদ্ধান্ত কেবল আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই নেওয়া হয়েছে।
সুইস মিডফিল্ডার রেমো ফ্রয়লার একে ‘মহাবিপর্যয়’ বলে বর্ণনা করেন।
