যাই ঘটুক, জয় ফুটবলেরই হয়

মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ফিফা বিশ্বকাপে দেখা গেল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি ছবি।

শনিবারের কথা। ইংল্যান্ডের কাছে ৬-৪ গোলে হেরে যাওয়ার পর ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা যখন বিষণ্ণ, ঠিক তখনই দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। দুই দলের সাতজন ফুটবলার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে গোল হয়ে প্রার্থনায় বসলেন। হার-জিতের পর একই দলের ফুটবলারদের এভাবে এক হওয়া নতুন নয়, তবে দুই প্রতিপক্ষের এমন সৌহার্দ্য যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল—ফুটবল মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার কী এক অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে!

অবশ্য এই ম্যাচের চাপ বা প্রাপ্তির সমীকরণ ফাইনালের মতো ছিল না। বড় প্রত্যাশা নিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত অহেতুক এক লড়াইয়ে নামতে হয়েছিল দুদলকেই। তবে পুরো টুর্নামেন্টে তাদের সুশৃঙ্খল আচরণের কথা ভাবলে, মাঠের এই মেলবন্ধনকে একেবারেই বেমানান বলা যাবে না।

কিন্তু আসল নাটক অপেক্ষা করছিল ফাইনালে।

নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের কানায় কানায় ভরা গ্যালারি আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের চোখ ছিল স্পেন-আর্জেন্টিনা লড়াইয়ে। দুর্দান্ত এক বিশ্বকাপের শেষটা যেমন হওয়া উচিত, মঞ্চ প্রস্তুত ছিল তেমনই। লড়াইটা চমৎকার হলেও ম্যাচের আবহ দিনশেষে বিষিয়ে ওঠে বাজেভাবে। বিশেষ করে শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার প্লেয়ার ও কোচিং স্টাফদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ে স্প্যানিশ শিবিরের ওপর, ধাক্কাধাক্কি থেকে গড়ায় হাতাহাতিতে। পদক দেওয়ার সময়ও সেই আক্ষেপ থেকে যায়—চ্যাম্পিয়নদের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্তটি সম্মান না জানিয়েই মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার একাধিক ফুটবলার।

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এই দুই দৃশ্য যেন ফুটবলের দুই মেরু।

৪৮ দলের এই বিশাল বিশ্বকাপে শৃঙ্খলার বিচারে সবচেয়ে বাজে দল ছিল আর্জেন্টিনা। আট ম্যাচে তারা ফাউল করেছে ১১৩টি, কার্ড দেখেছে ১৫টি (১৩টি হলুদ ও ২টি লাল)। অথচ সমান ম্যাচ খেলে ইংল্যান্ড পেয়েছে ৯টি কার্ড। আর ফাইনালিস্ট স্পেন ও শেষ চারের ফ্রান্স তো পুরো টুর্নামেন্ট শেষ করেছে মোটে ৬টি করে হলুদ কার্ড নিয়ে, কোনো লাল কার্ড ছাড়াই!

আর্জেন্টিনার এমন রেকর্ড কিন্তু এবারই প্রথম নয়। ২০২২ বিশ্বকাপেও ১৭টি হলুদ কার্ড নিয়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের শীর্ষে ছিল তারা। অথচ সেবার বাকি তিন সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো, ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার কার্ড ছিল যথাক্রমে ৮, ৮ ও ৬টি।

ফাইনালের রাতেও সেই পুরোনো আর্জেন্টিনার দেখা মিলেছে—৬টি হলুদ ও ২টি লাল কার্ড। অন্যদিকে চ্যাম্পিয়ন স্পেন পুরো ম্যাচটি খেলেছে একটিও কার্ড না দেখে!

তবে কার্ডের চেয়েও বড় সত্য লুকিয়ে আছে খেলার পরিসংখ্যান ও শক্তির নিরিখে।

স্পেন যেখানে গোলমুখে ১২টি শট নিয়েছে, আর্জেন্টিনা সেখানে অন-টার্গেটে একটা শটও চালাতে পারেনি! বলের দখল (স্পেনের ৬০.২% বনাম আর্জেন্টিনার ৩২.৫%), সফল পাস কিংবা ‘এক্সপেক্টেড গোল’ (স্পেনের ২.৫২ বনাম আর্জেন্টিনার ০.০৭)—প্রতিটি সূচকেই তারা ছিল যোজন যোজন পিছিয়ে।

পরিসংখ্যানের দুটি তথ্য এখানে আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি (৪টি) লাল কার্ড দেখার রেকর্ড এখন আর্জেন্টিনার। আর খেলা শেষ চারটি ফাইনালের তিনটিতেই (১৯৯০, ২০১৪ ও ২০২৬) তারা গোলপোস্টে একটা সঠিক শটও মারতে পারেনি।

শুধু উপাত্ত দিয়ে সব বিচার করা যায় না ঠিকই, তবে এ তথ্যগুলো স্পষ্ট প্রশ্ন তোলে—খেলার মাঠে আবেগ ও আত্মসংযমের ভারসাম্য কতটা ছিল?

বিজয়ী স্পেন যে ধোয়া তুলসী পাতা ছিল, তা নয়। প্রয়োজনমতো শারীরিক ফুটবল তারাও খেলেছে। তবে পার্থক্যটা ছিল দর্শনে। ২০১০ সালে বিশ্বজয়ের পাশাপাশি ‘ফিফা ফেয়ার প্লে’ ট্রফিও জিতেছিল স্পেন। বার্সেলোনা ঘরানার পাসিং ফুটবলে ভর করে তারা শুধু জয়ীই হয়নি, জয় করেছিল মনও। যারা বল পায়ে রাখতে জানে, নোংরা খেলার প্রয়োজন তাদের পড়ে না।

লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই নতুন স্পেন সেই পুরোনো ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই নতুন রূপ নিয়েছে। আরাগোনেস ও দেল বোস্কের রেখে যাওয়া ফুটবলে তারা এনেছে গতি ও বাস্তবতার ছোঁয়া। এখন তারা উপরে উঠে চাপ বাড়ায়, লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ গড়ে। আর্জেন্টিনার সংঘাতের মুখে পড়েও তারা ফুটবলীয় সত্তা হারায়নি। ২০১০ সালে ডাচদের আগ্রাসী মনোভাবের জবাবে যেভাবে গোল করে ম্যাচ বের করেছিলেন ইনিয়েস্তা, এবারও ঠিক একইভাবে ফুটবল খেলেই জয় তুলে নিয়েছে স্পেন।

এই বিশ্বকাপ আমাদের বড় একটি শিক্ষা দিয়ে গেল—সাফল্য শেষ পর্যন্ত কীভাবে অর্জিত হলো, ইতিহাস সেটাও মনে রাখে।

লিওনেল স্কালোনির সাফল্যকে খাটো করার সুযোগ নেই। টানা দুটি ফাইনালে উঠে আর্জেন্টিনা প্রমাণ করেছে তারা এখনও পরাশক্তি। তবে টুর্নামেন্টের শেষ দৃশ্যটা এক বড় ট্র্যাজেডি হয়ে থাকবে। যে দলের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি—লা মাসিয়ার সন্তান, নান্দনিক ফুটবলের প্রতিচ্ছবি এবং যে লা মাসিয়া মূলত এই স্পেন দলেরও প্রেরণা—তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটা যেভাবে বিশৃঙ্খলা আর ব্যর্থতায় শেষ হলো, তা মেসির নিজের অর্জিত মহত্ত্বের সঙ্গে বড্ড বেমানান।

 

Related Articles

Latest Posts