[পরিকল্পনার চেয়েও অনেক দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে ঢাকা। জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে, নিচু জমিতে গড়ে উঠেছে স্থাপনা এবং নির্মাণ করা হয়েছে এমন সব বহুতল ভবন, যার মধ্যে অনেকগুলো হয়তো বড় ভূমিকম্পে টিকবে না। ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের শেষ পর্বে দ্য ডেইলি স্টার খতিয়ে দেখেছে, বছরের পর বছর গবেষণা, বিনিয়োগ ও নানা প্রস্তুতির পরও বড় ভূমিকম্পের জন্য বাংলাদেশ আসলে কতটা প্রস্তুত।]
ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হওয়ার পরও বড় মাত্রার ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতি একেবারেই অপর্যাপ্ত বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের দুর্বল অবকাঠামো, প্রস্তুতির অভাব এবং বিশেষ করে দুর্যোগ-পরবর্তী কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এই অবস্থায় ঢাকায় বড় কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে তা ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলে প্রতি ১০০ থেকে ১২৫ বছর পরপর ৭ মাত্রার এবং ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরপর ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত ১০০ বছরে এই অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। সেই ধারাবাহিকতায় একটি বড় ভূমিকম্প আসন্ন হতে পারে। আমার ধারণা, গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীতে হওয়া ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল বড় ভূমিকম্পের আগের ছোট ভূমিকম্প বা ফোরশক।’
বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সহসভাপতি অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, আমরা সব সময় ধারণা করতাম যে বড় ভূমিকম্প হয়তো মধুপুর ফল্ট থেকে তৈরি হবে। কিন্তু নরসিংদীর ভূমিকম্প প্রমাণ করেছে যে ৫ বা ৬ মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকার অনেক কাছাকাছি জায়গা থেকেও উৎপত্তি হতে পারে। আর ৬ মাত্রার ভূমিকম্পও ঢাকার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
উল্লেখ্য, মধুপুর ফল্ট রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
অধ্যাপক মুনাজ আরও বলেন, নরসিংদীর মতো অগভীর ভূমিকম্পগুলো বাংলাদেশে সাধারণ ঘটনা। এ ধরনের ভূমিকম্প ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ঘটে বলে এর শক্তি প্রবল বেগে মাটিতে আঘাত হানে, যার ফলে স্থাপনার ক্ষতি বেশি হয়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও এর আশপাশের অঞ্চলে গত কয়েক শ বছরে বেশ কয়েকটি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—১৭৬২ সালের আরাকান (চট্টগ্রাম-আরাকান উপকূল) ভূমিকম্প (আনুমানিক মাত্রা ৮.৫-৮.৮), ১৮৬৯ সালের কাছাড় ভূমিকম্প (৭.৫), ১৮৮৫ সালের মানিকগঞ্জের বেঙ্গল ভূমিকম্প (৭.১), ১৮৯৭ সালের আসামের ভূমিকম্প (৮.২-৮.৩), ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প (৭.৬), ১৯৩০ সালের আসামের ধুবড়ি ভূমিকম্প (৭.১), ১৯৩৪ সালের বিহার-নেপাল ভূমিকম্প (৮.০) এবং ১৯৫০ সালের আসাম ভূমিকম্প (৮.৬)।
এত বড় ঝুঁকির পরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখনো ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য একটি সমন্বিত প্রস্তুতি ও কৌশল ঠিক করতে পারেনি।
বহু বছর আগে জরুরি আপৎকালীন পরিকল্পনা শুরু হলেও বড় শহরগুলোতে এখনো দক্ষ স্বেচ্ছাসেবী দল, নিয়মিত মহড়া এবং ধারাবাহিক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির বড় অভাব রয়েছে। সিটি করপোরেশনগুলোতে ভূমিকম্পের জন্য কোনো আলাদা বিভাগ নেই। সরকারের ভূমিকম্পের ঝুঁকি মূল্যায়নের সক্ষমতাও সীমিত।
পড়ে আছে কোটি টাকার যন্ত্র
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘বাংলাদেশ আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’-এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত আরবান সেফটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট (ইউএসআরআই) প্রায় ২০ মাস অপেক্ষার পর আগের সরকারের শেষ দিকে অনুমোদন পায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা যাচাইয়ের জন্য প্রায় দুই বছর আগে ৫৬৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প শুরু হয়।
এই ইনস্টিটিউটে ২৫ ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্র রয়েছে। এসব যন্ত্রের সাহায্যে মাটির শক্তি পরীক্ষা, নির্মাণসামগ্রীর গুণমান যাচাই এবং এমনকি কাঠামোগত বিমের ভেতরে কতগুলো রড ব্যবহার করা হয়েছে, তা-ও নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ পড়ে আছে।
রাজউকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে শুধু ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়েই গবেষণা করেছে, কিন্তু গবেষণাকে কাজে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই সামান্য।
তিনি বলেন, ‘আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার ২০০টির বেশি ভবন পরীক্ষা করা হয়েছে। একটি আলাদা অফিস, ল্যাবরেটরি এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও এখন সব সুবিধা ও যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ইনস্টিটিউটটি ঠিকমতো চালু হলে এত দিনে ঢাকার অন্তত ১০ হাজার ভবনের ঝুঁকি যাচাই করা সম্ভব হতো।’ তিনি আরও জানান, এ ধরনের কাজ অত্যন্ত বিশেষায়িত, যা সাধারণ প্রকৌশলীদের পক্ষে করা সম্ভব নয়, তাই দক্ষ পেশাদারদের নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
২২ জুলাই রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ইনস্টিটিউটটি চালুর বিষয়ে পরের দিন একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, ইনস্টিটিউটের জন্য একজন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং অস্থায়ীভাবে জনবলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়া আমাদের জন্য একটি সতর্কতা। আশা করছি, খুব শিগগিরই এটি কাজ শুরু করবে এবং ভবন মূল্যায়নের কাজ শুরু হবে।
কয়েক সপ্তাহ আগে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছিলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জনবল নিয়োগের কাজ শেষ হবে বলে তারা আশা করছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের বাস্তবায়িত আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে।
প্রকল্পের সাবেক পরিচালক তারিক বিন ইউসুফ জানান, এ প্রকল্পের মাধ্যমে অনুসন্ধান ও উদ্ধারক্ষমতা বাড়ানো এবং স্যাটেলাইট ফোন, ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক, ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও নজরদারি ব্যবস্থাসহ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। জাইকার সহায়তায় ১২টি দুর্যোগসহনশীল মডেল কমিউনিটি ও স্কুলও তৈরি করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, সরকার ভূমিকম্পের ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ২০০৬ সাল থেকে সশস্ত্র বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের জন্য বিপুল পরিমাণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে।
নরসিংদীর ভূমিকম্পের পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল জানান, পূর্বাচলে ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল (স্পেশাল রেসকিউ টিম) প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যদি ভূমিকম্পে কোনো ফায়ার স্টেশন কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন এই রিজার্ভ টিমকে মোতায়েন করা হবে।’
এ ছাড়া প্রতিটি বিভাগীয় সদরে ২০ সদস্যের রিজার্ভ টিম এবং মিরপুর-১০-এ রাসায়নিক দুর্ঘটনার জন্য ৪০ সদস্যের একটি দল প্রস্তুত রয়েছে। দেশব্যাপী ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ৫৫ হাজারের প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে।
জাতীয় আপৎকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সারা দেশ থেকে অতিরিক্ত ১২০টি ফায়ার স্টেশন ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে ঢাকায় মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে, যাতে জরুরি প্রয়োজনে ক্রেন ও এক্সেভেটরের মতো ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায়।
দুর্যোগের সময় সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সংস্থা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একসঙ্গে কাজ করবে।
