ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং কার্বন নিঃসরণজনিত জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হওয়ার মধ্যেই বিশ্বের আটটি বড় তেল কোম্পানি মাত্র তিন মাসে ৯৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে।
এই বিপুল মুনাফার পর আবারও দাবি উঠেছে, সৌদি আরামকো, ব্রিটিশ পেট্রলিয়ামের (বিপি) মতো তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে পরিবেশের ক্ষতির দায় নিতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের জন্যও তাদের অর্থায়ন করতে হবে।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত আটটি তেল কোম্পানি জুনের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। এটি ছিল এমন প্রথম পূর্ণ আর্থিক প্রান্তিক, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারের (প্রায় ১৫ হাজার টাকা) বেশি হয়ে যায়।
তেল সরবরাহে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ধরনের বিঘ্নের সুযোগে কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করেছে। গত বছরের একই সময়ে তাদের সম্মিলিত মুনাফা ছিল ৫০ বিলিয়ন ডলারের কম। আর চলতি বছর তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে এর মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। জ্বালানির বাড়তি বিলের পাশাপাশি জলবায়ু সংকটও আরও তীব্র হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন পরিবেশকর্মীরা।
তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরামকো, বিপি, শেল, ইকুইনর, টোটালএনার্জিস, এনি, শেভরন ও এক্সনমোবিল—এই আটটি কোম্পানি গত তিন মাসে প্রতি মিনিটে ৭ লাখ ডলারের (প্রায় ৮ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার টাকা) বেশি মুনাফা করেছে।
একই সময়ে কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা) বেড়ে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩৭০ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা) বেশি হয়েছে। আর ঠিক এই সময়েই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ দেখা দেয়, যা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে আরও তীব্র হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রথমবারের মতো দেখানো হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কার্বন নিঃসরণের সঙ্গে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, শীর্ষ ১৪টি কোম্পানির প্রতিটির নির্গমনই ৫০টির বেশি তাপপ্রবাহ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।
সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো।
ইরান ও হুতি বাহিনীর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অবকাঠামোর কিছু ক্ষতি হলেও কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের ত্রৈমাসিক নিট আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ৭ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
কার্বন মেজরস ডেটাবেজ অনুযায়ী, ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো। এরপর রয়েছে শেভরন ও এক্সনমোবিল। শীর্ষ ১০ তালিকায় রয়েছে শেল ও বিপি।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু উদ্যোগ বিলম্বিত করতে ভূমিকা রেখে আসছে।
মঙ্গলবার এপ্রিল থেকে জুন সময়ের আর্থিক ফল প্রকাশ করে লন্ডনভিত্তিক কোম্পানি বিপি। এতে দেখা যায়, এ সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা হয়েছে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭০ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এটি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর প্রথম বছরের পর কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা। আগের তিন মাসে তাদের মুনাফা ছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক প্রান্তিকের ব্যবধানে মুনাফা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠন গ্লোবাল উইটনেসের জীবাশ্ম জ্বালানিবিষয়ক প্রধান প্যাট্রিক গ্যালি বলেন, বিপির আকাশছোঁয়া মুনাফা এ বছরের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারিগুলোর একটি। এটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানুষের দুর্ভোগ থেকে কারা মুনাফা করেছে। যখন দাবানল, খরা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, তখন কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের সম্পদ বাড়াতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু বিপর্যয় ত্বরান্বিত করার জন্য এখন বড় তেল কোম্পানিগুলোরই মূল্য পরিশোধের সময় এসেছে। তারা যদি ন্যায্য হারে কর দিত, তাহলে সেই অর্থ দিয়ে আরও বেশি বন্যা ও অগ্নিনির্বাপণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কিংবা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা যেত।
ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থের প্রচারাভিযানবিষয়ক প্রধান রোজি ডাউনস বলেন, বিপি যখন আবারও বিপুল মুনাফা করছে, তখন লাখো পরিবারকে আকাশছোঁয়া জ্বালানি বিলের বোঝা বইতে হচ্ছে। একইসঙ্গে জলবায়ু সংকটও দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তবে বিপির নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেগ ও’নিল বলেন, সংকটের সময় বাজারে তেলজাত পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
গত বছরের শুরুতে পরিবেশগত লক্ষ্য থেকে সরে এসে ‘মৌলিক পুনর্গঠন’ ঘোষণা করার পর বিপি সবুজ জ্বালানিতে ব্যয় কমিয়ে দেয়। কোম্পানিটি জ্বালানি রূপান্তর খাতে বার্ষিক বাজেট ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা) থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা থেকে ২৪ হাজার ৭২০ কোটি টাকা) নামিয়ে এনেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপি যুক্তরাজ্যের উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প যৌথ উদ্যোগে হস্তান্তর করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থলভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ ব্যবসা বিক্রি করেছে। মঙ্গলবার তারা আরও ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৪ বিলিয়ন ডলারের বায়োগ্যাস ব্যবসাও বিক্রি করবে। এই ব্যবসার মাধ্যমে আবর্জনার ভাগাড় থেকে মিথেন গ্যাস সংগ্রহ করা হয় এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নবায়নযোগ্য গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েতের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল সমর্থিত একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে তাদের সৌরবিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান লাইটসোর্স বিক্রির বিষয়েও আলোচনা চলছে।
শুক্রবার ৬০ বছরেরও বেশি সময় পরিচালনার পর উত্তর সাগরে তাদের তেল ও গ্যাস ব্যবসা বিক্রির জন্য বাজারে তোলে বিপি। এরপর আবারও যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান ওঠে, যেন তারা উত্তর সাগরের বিতর্কিত দুটি নতুন তেল ও গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা বাতিল করে।
গত সপ্তাহে শেল জানায়, কাতারের গ্যাসক্ষেত্রে যুদ্ধের কারণে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হওয়ায় গ্যাস উৎপাদন কমলেও কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়ে ৯ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা) পৌঁছেছে। এটি তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা।
একই সময়ে নরওয়ের ইকুইনরের মুনাফা গত বছরের একই সময়ের ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা) থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ৩৯ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা) পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে শেভরন ও এক্সনমোবিলের মুনাফা নিয়ে সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের সঙ্গে তার যুদ্ধ থেকে এই দুই কোম্পানি ‘অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন’ করছে। প্রয়োজনে এই অর্থ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে তাদের বাধ্য করা হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
শেভরন জানিয়েছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের নিট মুনাফা হয়েছে ১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ গুণের বেশি।
এক্সনমোবিল জানিয়েছে, তাদের মুনাফা হয়েছে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ২২০ কোটি টাকা। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা।
গ্লোবাল উইটনেসের প্যাট্রিক গ্যালি বলেন, তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফার বিষয়টি কতটা গুরুতর, তা বোঝা যায় যখন তাদের অন্যতম বড় মিত্র বলে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাদের অতিরিক্ত লাভের সমালোচনা করেন।
এই গ্রীষ্মে ইউরোপে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না হলে এমন তাপপ্রবাহ কার্যত অসম্ভব ছিল।
ধারণা করা হচ্ছে, এই তাপপ্রবাহে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মে ও জুন মাসেই যুক্তরাজ্যে মারা গেছেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ।
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। কোরিয়ার আবহাওয়া সংস্থা জনগণকে সব ধরনের বাইরের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
জুলাই মাসে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা আরও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এখন প্রতিটি তাপপ্রবাহই আগের চেয়ে বেশি তীব্র এবং বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠছে। গত অক্টোবরে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত গরমের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতি মিনিটে একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এখন দুঃস্বপ্নের রূপ নিচ্ছে। তাই দ্রুত কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে।
ইউরোপে ধারাবাহিক তাপপ্রবাহে তীব্র খরা দেখা দিয়েছে। এতে ভুট্টা, সূর্যমুখী ও বিভিন্ন সবজির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত ৯০ লাখ টন শস্য কম উৎপাদিত হবে। যুক্তরাজ্য ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফসল উৎপাদনের মুখে পড়তে পারে।
শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে বড় বড় দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হয়েছে।
দাবানলের ধোঁয়াও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ১৫ থেকে ২৩ জুলাইয়ের দাবানলের ধোঁয়ার কারণে মাত্র এক সপ্তাহেই প্রায় ৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতি বছর দাবানলের ধোঁয়ার কারণে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের আয়ু কমে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারী বৃষ্টিপাতও বেড়েছে। কারণ বায়ুর তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে তা ৭ শতাংশ বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে।
এর উদাহরণ হিসেবে চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়, যা আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে।
একই সময়ে পাকিস্তান ও ভারতে বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি ঘটেছে এবং বহু মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তর-পশ্চিম চীনেও ভারী বৃষ্টির কারণে বহু মানুষ মারা গেছেন এবং হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
