যারা সরকারের সমালোচনা করছেন, তারা হিংসা-বিদ্বেষ-অবিবেচনা থেকে করছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুরু।
বিরোধীদলের কর্মসূচির সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচ মাসে সরকারকে আপনি কী সমালোচনা করবেন?…কোনো মানুষ এগুলো সমর্থন করে বলে আমার মনে হয় না।’
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, টিম লিডার ভালো না হলে তো টিম ভালো ফাংশন করবে না। সেই টিম লিডার খুবই ভালো করছেন এবং গঠনমূলকভাবে করছেন, সমালোচনা যাই থাকুক না কেন।
আজ শুক্রবার সকালে ঢাকায় বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
কারও উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, গতকাল সচিবালয়ে আমরা যে চিত্র দেখেছি, আপনারা বিশ্বাস করবেন, এটা দেখে আমি একটু আতঙ্কিত হয়েছি ওই কারণে যে, আমরা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার ব্যবস্থা করছি কি না। আপনারা বলেন, ছয় মাসের সরকার, সচিবালয়ে ঘেরাও করার মতো পরিস্থিতি আসলে তৈরি হয়েছে?
রাজনৈতিক বন্ধুদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে আশাবাদ ব্যক্ত করে নুরুল হক বলেন, ‘কারণ এই সরকার যদি বিপদে পড়ে, গোটা দেশ বিপদে পড়বে। যারা সচিবালয়ে ঘেরাও করতে গেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে।’
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট আমরা বিজয়ের কথা বললেও এই ৫ আগস্টেও কিন্তু অনেক মানুষ নিহত হয়েছে। এই বাংলাদেশে রক্তের দাগ এখনো শুকায় নাই রাজপথ থেকে। এখনো আহত, পঙ্গুত্ব বরণকারী যুবক-তরুণ ছাত্ররা তাদের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। বাবা-মা এখনো কোনো অনুষ্ঠানে এলে কেউ কান্না করে অজ্ঞান হয়ে যায়। কেউ কান্না করতে করতে বক্তব্য দিতে পারে না। আর সেই সময়ে আমরা দেখি যে, সেই ফ্যাসিস্ট ও মাফিয়া গোষ্ঠী, যারা এই বাংলাদেশকে নরকে পরিণত করে আমাদেরকে জাহান্নাম দেখিয়েছিল, তারা বলে রাজনীতিতে ফিরবে, দেশে আসবে।’
‘শুধু রাজনৈতিক নেতা নয়, এই দেশের নাগরিক হিসেবে বলি, এই সরকার ভালো পারফর্ম না করলে সামনে অন্য সরকার আসবে, কিন্তু এই আওয়ামী মাফিয়া গোষ্ঠীর প্রশ্নে আমাদেরকে এক ও অভিন্ন থাকতে হবে। আমাদেরকে আপসহীন থাকতে হবে,’ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন তিনি।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘আমি যেটা মনে করি যে, আমাদের দুষ্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্র বিদেশি অপশক্তির ইন্ধনে সহায়তায় চেষ্টা করবে সিভিল ক্যু, মিলিটারি ক্যু করার জন্য। আপনারা দেখেছেন, ৯৬-এ জনতার মঞ্চ গঠনের মধ্যে দিয়ে সে সময় সচিবালয়কে অচল করে দেওয়া হয়েছিল। আপনাদেরকেও বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত (মিসগাইড) করতে, বিভিন্ন মিশন-এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে অনেকে আসতে পারে। সেই বিষয়ে আপনারা সতর্ক থাকবেন।’
‘এই মাফিয়া গোষ্ঠী যদি আবার কোনোভাবে ফিরে আসতে পারে, এই বাংলাদেশকে কী বানাবে আপনারা এটা চিন্তা করতে পারেন? যে মানুষ ক্ষমতায় থাকার জন্য এভাবে এক মাসে ৫০ হাজার মানুষকে পঙ্গু করতে পারে, দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করতে পারে…সবচেয়ে নির্মম এবং আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে, এ রকম একটা নিকৃষ্ট গণহত্যাকারী, খুনিকে আশ্রয় দিয়েছে আমাদের বন্ধু দাবি করা প্রতিবেশী দেশ। ওইখানে সে নিরিবিলি থাকুক। সে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকুক, কিন্তু তাকে দিয়ে উসকানি দেওয়াচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করিয়ে, ভিডিও-অডিও কলে কথা বলার সুযোগ করে দেয় এবং এটা দিয়ে নিউজ করে তার এই মাফিয়া চক্রকে একটু চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে যে, “আপা আসবে”, “বাংলাদেশে আবার তারা ক্ষমতায় আসবে”। এখানে যেন আমরা আপসহীন থাকি,’ যোগ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেকদিন ধরে এই সংকট, কিন্তু এই সরকারের বয়স তো পাঁচ মাস। পাঁচ মাসের শিশু সরকার। এই সরকার তো এই বিপদ বা এই সংকট তৈরি করেনি। ওই পুরোনো সংকট এই সরকারকে টেনে নিতে হচ্ছে।’
প্রতিটি খাত নিয়ে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করেন নুরুল হক। পে স্কেল নিয়ে বলেন, ‘আমাদের অর্থমন্ত্রী সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা তো প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়েই বক্তব্য দিয়েছেন। আশা করি যে আপনাদের পে স্কেল বাস্তবায়ন হবে।’
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের দুর্নীতিমুক্ত রাখতে নিজের ভাবনা তুলে ধরে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেখেন, বর্তমান সরকার এমপিদের করমুক্ত গাড়ি আমদানি বন্ধ করেছে, প্লট সুবিধা বন্ধ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার এর একটা যৌক্তিকতা হচ্ছে এ রকম যে, একজন সাধারণ মানুষও এমপি হয়ে যায় কেউ যদি মানুষের মন জয় করতে পারে। এখনকার যে নির্বাচনী ব্যবস্থা, আগের মতো তো ব্যবস্থা নাই যে রাতে ডিসিরা (জেলা প্রশাসক) ভোট করে দেবে, ইউএনওরা (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) ভোট করে দেবে কিংবা আপনি কেন্দ্র দখল করে, পিটিয়ে নেতা হয়ে যাবেন। একটা স্বচ্ছ নির্বাচন হচ্ছে, যাদের জনসম্পৃক্ততা আছে, জনগণের কাছাকাছি যারা থাকে, তারা ভোটে দাঁড়ালে অনেকে হয়ে যাচ্ছে। এবার আমার মতো কয়েকজন তরুণ এমপি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক পর্যায়ে সংসদীয় এলাকায় যাওয়ার জন্য আমার একটা ভালো বাহন দরকার, কারণ রাস্তাঘাটের যে অবস্থা। সে ক্ষেত্রে ভালো একটা গাড়ি যদি কিনতে যাই, সেই সক্ষমতা তো আমার নাই! আমার তো জীবনও ঝুঁকিতে! আমি যদি একটা ছোট গাড়ি নিয়ে যাই, ওই যে ট্রাকের ড্রাইভার, বাসের ড্রাইভাররা যেটা বলে—বামে প্লাস্টিক, ডানে প্লাস্টিক। কোনোভাবে মেরে দিলে তো আমি নিজে শেষ। এমপি শেষ। আমি তো প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তারপরও একটা গাড়ি পাচ্ছি, কিন্তু আমি বলছি এটা এমপিদের দরকার।’
‘সরকারকে পাঁচ বছরের জন্য একটা গাড়ি সরবরাহ করতে হবে, যতদিন সে এমপি থাকবে ততদিন সেই গাড়ি ব্যবহার করবে,’ পরামর্শ দেন তিনি।
মন্ত্রীদের ন্যূনতম বেতন ১০ লাখ ও এমপিদের ৫ লাখ টাকা হওয়া উচিত মন্তব্য করে নুরুল হক বলেন, ‘এটা আমার জন্য না। আমি এখন এমপি, প্রতিমন্ত্রী আছি। পরের মেয়াদে নাও থাকতে পারি।’
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য ৫৫ হাজারের মতো বেতন পান, মন্ত্রীর এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রী ৯২ হাজার টাকা। এলাকায় গেলে অমুকের চিকিৎসার জন্য সহায়তা প্রয়োজন; অমুক মেয়ের বিয়ে দেবে সেখানে একটু সহযোগিতা প্রয়োজন; যুব-তরুণ সমাজ আসে তারা একটা খেলার আয়োজন করেছে, তাদের পুরস্কার মোটরসাইকেল এমপি সাহেব দেন—এই যে চাপ! এটা এমপি সাহেব কোথায় থেকে দেবেন? এটা দেওয়ার জন্য যাদের টাকা-পয়সা আছে, জমিদার ছাড়া বাকিদের পক্ষে তো সম্ভব না! এটা দিতে হলে নয়-ছয়, এখানেরটা ওইখানে, ওইখানেরটা এইখানে করা লাগবে। বিরোধীদলের অনেকে বললে বা আবার আমরা বললেও অনেক পলিটিক্স হতে পারে যে, সে এমপি হয়ে তার বেতন বাড়িয়ে নিতে চায়।’
প্রধানমন্ত্রীর সময় সাপেক্ষে চলতি মাসের শেষের দিকে সরকার প্রবাসী কার্ড উদ্বোধন করবে জানিয়ে তিনি বলেন, এই কার্ড চালু হলে প্রবাসীদের পাসপোর্ট-ভিসা সেবা পেতে ও বিমানবন্দরের ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হবে।
‘কারণ এই কার্ড যাদের থাকবে, বিভিন্ন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পাবেন,’ যোগ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ বছরের দৈত্য-দানবীয় একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর মানুষ যখন কথা বলার মতো পরিবেশ পেয়েছে, তখন মন খুলে তার দাবি-দেওয়া নিয়েও কথা বলেছে। কারণ এতদিন বলতে পারে নাই। যৌক্তিক কথা বলতে গিয়েও জামায়াত-বিএনপির ট্যাগ লাগিয়ে চাকরিচ্যুত করতে পারে—এই ভয়েও অনেক নির্মম সত্য কিংবা অনেক অন্যায়-অবিচার, চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম-নীতি চুপচাপ মেনে নিয়েছে।’
সরকারি বেতন ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা করতে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন জানিয়ে নুরুল হক বলেন, ‘যারা দিনমজুরের কাজ করে, সেও এখন দিনে ৬০০-৭০০ টাকা পায়। ওই হিসাবে আমি বলেছিলাম যে, গড়ে তার ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় হয়। তাহলে একজন সরকারি, সে ছোট পদেই চাকরি করুক, কিন্তু সমাজের যে দৃষ্টি-ভঙ্গি, তাতে একটা মর্যাদাপূর্ণ জীবন-যাপন করার মতো ন্যূনতম দুইটা ডাল-ভাত খেয়ে থাকার মতো বেতন যদি না দেওয়া হয়, তাহলে আসলে তার অন্য কিছু করা ছাড়া উপায় নাই!’
