শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ: ভারত কী দেখবে, সিদ্ধান্ত নেবে কে?

ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। তবে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো হবে কি না, সেই বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি নয়াদিল্লি।

গত রোববার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ এক ভারতীয় কর্মকর্তা বলেন, হস্তান্তরের সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত আমাদের আদালত নেবে, এটি কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আদালতের প্রক্রিয়ায় দেখা হবে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারত ইতোমধ্যে তাকে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও বলেছেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে এবং কোনো আপডেট থাকলে জানানো হবে।

গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ডিসেম্বরে তিনি নিজেই বাংলাদেশে ফিরবেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তীব্র জনরোষের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অনুরোধ পাওয়ার পর ভারত শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে পরীক্ষা করবে? এই পথে কী কী আইনি প্রশ্ন আসতে পারে? আর কোন পর্যায়ে ভারতের আদালত বা সরকার সিদ্ধান্ত নেবে?

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি হয়। এই চুক্তির আওতায় এক দেশের অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট শর্তে অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা আছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ২০১৩ সালের দ্বিপক্ষীয় বন্দি বিনিময় চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্রও দিয়েছে বাংলাদেশ।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত বা আদালতের সাজা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন হলে তাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তবে কোনো অপরাধকে প্রত্যর্পণযোগ্য হতে হলে সেটি শুধু বাংলাদেশে অপরাধ হলেই হবে না, ভারতেও সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে। একে বলা হয় ‘দ্বৈত অপরাধ’ নীতি।

প্রত্যর্পণ চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ করা হবে না।

তবে একই অনুচ্ছেদে বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং হত্যায় প্ররোচনার মতো অপরাধ।

অর্থাৎ, কোনো মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত বলা হলেই যে প্রত্যর্পণ বন্ধ হয়ে যাবে, বিষয়টা এত সরল নয়।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচার করা হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনে পলাতক বা অন্য দেশে থাকা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া কীভাবে হবে, তার কাঠামো দেওয়া আছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিপিভি বা কনস্যুলার, পাসপোর্ট অ্যান্ড ভিসা বিভাগ প্রত্যর্পণসংক্রান্ত বিষয়ে নোডাল অফিস হিসেবে কাজ করে।

চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট আইন বিবেচনা করে ভারত সরকার প্রয়োজন মনে করলে একজন ইনকোয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে।

সেই ম্যাজিস্ট্রেট বাংলাদেশের পাঠানো অভিযোগ ও নথি পরীক্ষা করবেন। মূল প্রশ্ন হবে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিকভাবে কোনো মামলা দাঁড়ায় কি না।

ভারতের মানবাধিকার ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি এর আগে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাওয়ার পর ভারত সরকার একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করবে। সেই ম্যাজিস্ট্রেট খতিয়ে দেখবেন যে হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটুকু।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হাসিনা আদালতে হাজির হলে ম্যাজিস্ট্রেট বাংলাদেশের পাঠানো তথ্য, নথি ও প্রমাণ দেখবেন। অনেকটা ভারতে ওই মামলার বিচার হলে যেভাবে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তি যাচাই করা হয়, সেভাবেই।

ভিত্তি পাওয়া গেলে ম্যাজিস্ট্রেট হাসিনাকে ভারতের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিতে পারেন এবং তদন্তের ফলাফল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে রিপোর্ট করবেন। সেই রিপোর্টের সঙ্গে সরকারের কাছে বিবেচনার জন্য হাসিনা যদি কোনো লিখিত বক্তব্য দিতে চান, সেটিও পাঠাতে পারেন।

আর যদি মনে করেন, অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক ভিত্তিই নেই, তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার পথও রয়েছে।

উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণের প্রাথমিক নির্ভরযোগ্যতা দেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় নথি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৬ সালের সংশোধনীর আগে প্রত্যর্পণের অনুরোধের সঙ্গে অপরাধের প্রমাণ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনুরোধকারী দেশের আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি আরও বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী অনুরোধকারী দেশকে সব প্রমাণ দিতে না হলেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পরিচয়ের প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথি দিতে হয়।

তবে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা হতে পারে। কারণ তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং ভারত সরকারের ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ সেখানে আছেন বলে নয়াদিল্লি জানিয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং ভারতের আইনে কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ না করার সুযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো, অভিযোগটি যদি রাজনৈতিক হয়। আরেকটি ক্ষেত্র হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দেখাতে পারেন যে তাকে ফেরত পাঠালে তিনি ন্যায্যবিচার পাবেন না।

উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি বলেন, আইন ও চুক্তি অনুযায়ী ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। যদি অভিযোগগুলো রাজনৈতিক হয় অথবা যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি (এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা) প্রমাণ করতে পারেন যে বাংলাদেশে তিনি ন্যায্যবিচার পাবেন না, তাহলে ভারত তাকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকার করতে পারে।

উজ্জয়িনী চ্যাটার্জির মতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে প্রত্যর্পণের অনুরোধটি সদিচ্ছা থেকে করা হয়েছে কি না এবং শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ন্যায্যবিচার পাবেন কি না।

তিনি বলেন, ব্যতিক্রমও আছে। তবে আমার মনে হয় আইনি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মনোযোগের মূল জায়গা হবে ঘটনার প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ও এই বিচার প্রক্রিয়াটি প্রতিহিংসামূলক কি না, সেটা দেখা।

তার মতে, ন্যায্যতা ও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি পরিষ্কার করে বলেছেন, ম্যাজিস্ট্রেট ন্যায্যবিচার হবে কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন না। এটি ভারতের সরকারের বিবেচনার বিষয়।

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে দণ্ডিত করা হয়েছে।

উজ্জয়িনী চ্যাটার্জি উল্লেখ করেন, সাধারণ হত্যা মামলার তুলনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অনেক বেশি জটিল এবং এ ধরনের মামলায় প্রমাণের মানদণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতে মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে আলাদা কোনো বিশেষ আইন নেই। তবে উজ্জয়িনীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ড, হত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ বা গুমের মতো অপরাধ ভারতের নিজস্ব আইনেও অপরাধ।

তাই বাংলাদেশের অভিযোগের ধরন ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না, সেটি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে।

সর্বশেষ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে একজন ভারতীয় কর্মকর্তাও ঠিক এই বিষয়টির কথা বলেছেন।

ভারত এখনো প্রকাশ্যে জানায়নি, শেখ হাসিনা দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন কি না। তাকে শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, সেটাও স্পষ্ট নয়।

ভারত শুধু বলেছে, তিনি ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ দেশটিতে অবস্থান করছেন।

উজ্জয়িনী চ্যাটার্জির মতে, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত না পাঠানোর নীতি রয়েছে, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা মর্যাদা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে ভারত শরণার্থী সুরক্ষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। তারপরও দেশটির নিজস্ব আইন ও দীর্ঘদিনের চর্চায় কিছু ক্ষেত্রে শরণার্থী সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

গত কয়েক মাসে ভারতের প্রকাশ্য অবস্থানে বড় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বলেছে, বাংলাদেশের অনুরোধটি আইনি প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা হচ্ছে।

প্রত্যর্পণের বিষয়টি ঠিক কোন জায়গায় আছে, এখন পর্যন্ত তা পরিষ্কার করে বলেনি ভারত সরকার। তবে বিষয়টি যে প্রাথমিকভাবে আদালতের অনেকটা বিচারিক প্রক্রিয়ার মতো করে এগোবে, তাতে সন্দেহ নেই।

Related Articles

Latest Posts